ট্রাম্পের পরবর্তী টার্গেট হওয়ার ভয়েই কি নীরব পুতিন?

রুশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় একটি ‘মিম’ (ব্যঙ্গাত্মক ছবি) বর্তমানে ভাইরাল। সেখানে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি উদ্ধৃতি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, ‘আমরা আপনজনদের ছেড়ে দিই না।’ এ বার্তার পাশে পুতিনের সঙ্গে এমন সব নেতার ছবি দেওয়া হয়েছে, যাদের একসময় মস্কোর ‘প্রধান মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের এ তালিকায় রয়েছেন লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ২০১১ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা হয়েছিল। আছেন সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি পালিয়ে মস্কোয় আশ্রয় নিয়েছেন। আরও আছেন ইউক্রেনের ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ। ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাকে দ্রুত মস্কোয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

ওই বার্তার সবশেষে রয়েছে পুতিন ও নিকোলা মাদুরোর হাস্যোজ্জ্বল ছবি। গত শনিবার মার্কিন বিশেষ বাহিনী ডেলটা ফোর্সের কমান্ডোরা মাদুরোকে তার শোবার ঘর থেকে তুলে নিয়ে যান। মাদক পাচারের অভিযোগে বর্তমানে নিউইয়র্কের আদালতে তার বিচারকাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার সরবরাহ করা ‘বুক-২এমএ’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও রাডারগুলোয় হামলা চালায়। দুই দেশের ‘কৌশলগত জোটের’ অংশ হিসেবে সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে এসব ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল রাশিয়া।

তবে কারাকাসের সঙ্গে মস্কোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি ছিল অস্পষ্ট। কোনো বিদেশি আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলাকে তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তা দেওয়ার কোনো অঙ্গীকার বা শর্ত সেই চুক্তিতে ছিল না।

মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘সশস্ত্র আগ্রাসনের এক অগ্রহণযোগ্য কাজ’ বলে উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুরোপুরি নীরব ভ্লাদিমির পুতিন। সামরিক হস্তক্ষেপ তো দূরের কথা, তিনি একটি শব্দও খরচ করেননি।

‘পুতিনের মর্যাদা ও সুনামে বড় ধাক্কা’

পর্যবেক্ষকেরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওই অভিযানের ফলে রাশিয়ার সামনে দুই ধরনের পরিণতি দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, ক্রেমলিনের ইতিমধ্যে ম্লান হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক সম্মানের তাৎক্ষণিক ক্ষতি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনসহ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চল এবং জ্বালানিসমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ায় মস্কোর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা তৈরি হয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্সের প্রধান আলিশার ইলখামভ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘একদিকে লাতিন আমেরিকায় পুতিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র ছিলেন মাদুরো। ফলে তার এ পরিণতিতে পুতিনের মর্যাদা ও সুনামে বড় ধাক্কা লেগেছে। তবে পুতিনের কাছে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছেন।’

ইলখামভ মনে করেন, ট্রাম্প যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করছেন, তার গুরুত্বের কাছে এই মিত্রের (মাদুরো) মূল্য পুতিনের কাছে খুব একটা বেশি নয়। তিনি বলেন, ‘এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা এখন শক্তির অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে চলছে, আন্তর্জাতিক আইনের ওপর নয়। অথচ একসময় জাতি বা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বই ছিল আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি।’

মাদুরোর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তার সঙ্গে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর মস্কোর সামরিক নিষ্ক্রিয়তার মিল রয়েছে। সে সময় বিরোধীরা সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করলে আসাদ আতঙ্কিত হয়ে দামেস্ক থেকে পালিয়ে মস্কোতে আশ্রয় নেন।

গত বছরের আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প ও পুতিন সম্ভবত মাদুরোকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন।

জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির রাশিয়া-বিষয়ক গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সম্ভবত অ্যাঙ্কোরেজে বা এরও আগে তাদের (ট্রাম্প-পুতিন) মধ্যে কথা হয়েছিল।’

এ সমঝোতার আওতায় হয়তো ইউক্রেন ইস্যুতে পুতিনকে কিছু ছাড় দিয়েছেন ট্রাম্প। বিনিময়ে ভবিষ্যতে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে যৌথ অংশীদারত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো থাকতে পারে।

মিত্রোখিন বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের যে আগ্রহ, সেটিও একই সূত্রে গাঁথা। সেখান থেকে তিনি “তাঁর জন্য নির্ধারিত অংশ”- বিশ্বের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে চান।’

রাশিয়ার বর্তমান তেলখনিগুলোর মজুত ফুরিয়ে আসার পর সাইবেরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের জলাভূমি এলাকায় অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শেল অয়েল ভান্ডার ‘বাঝেনোভস্কা সভিতা’র উন্নয়নে মার্কিন কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো শেল অয়েল ও গ্যাস উত্তোলনে পথপ্রদর্শক হলেও রুশ কোম্পানিগুলোর কাছে এ ধরনের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। বাঝেনোভস্কা সভিতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে হোয়াইট হাউস ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ শিকারে সক্ষম হবে।

ইউক্রেনের কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক আলেক্সি কুশচ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘চীন যাতে সেখানে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাঝেনোভস্কা সভিতার নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কারণ, এর নিয়ন্ত্রণ পেলে বেইজিং জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।’

এদিকে মাদুরোর পতন পুতিনের জন্য খুব একটা বড় ঝুঁকি তৈরি করবে না বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক।

‘পুতিন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হতে পারবেন না’

আরেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মাদুরোকে ত্যাগ করলেই যে ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়।

গত সোমবার ট্রাম্প বলেন, ডিসেম্বরের শেষ দিকে উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার ভালদাই বাসভবনে ইউক্রেন তাকে (পুতিন) হত্যার চেষ্টা করেছিল বলে পুতিন যে দাবি করেছেন, তা তিনি ‘বিশ্বাস করেন না’।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ গালিয়া ইব্রাগিমোভা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় চোখ বুজে থেকেও পুতিন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হতে পারবেন না।’

ইব্রাগিমোভা আরও বলেন, ‘পুতিন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত এই ভেবে যে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলেই এমন কেউ ছিলেন, যিনি মার্কিনদের কাছে তথ্য পাচার করেছেন। পুতিনের মধ্যে সব সময় একটি আতঙ্ক কাজ করে যে সবাই তাঁর পেছনে লেগেছেন। ফলে তিনি এখন নিজের নিরাপত্তা আরও জোরদার করবেন।’

এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মাদুরোকে এভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনা পুতিনকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপহরণের পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
ইতিমধ্যে ক্রেমলিনপন্থী বিশ্লেষকেরা মাদুরোর পতনকে মস্কোবিরোধী একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন, যা শেষ পর্যন্ত ‘ব্যর্থ’ হবে বলে তাদের দাবি।

গত মঙ্গলবার রুশ সংবাদ সংস্থা আরআইএ নভোস্তিতে এক নিবন্ধে বিশ্লেষক কিরিল স্ট্রেলনিকভ লিখেছেন, ‘আমাদের শুধু এটা বুঝতে হবে, সম্মিলিত পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে হারানোর চেষ্টা কখনো ছাড়বে না।’ তিনি লেখেন, ‘তোমরা চেষ্টা করে দেখতে পারো, কিন্তু অনেক ওপর থেকে আছাড় খেয়ে পড়বে।’

এমআই/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
আশুলিয়ায় আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের এসআইসহ আহত ২ Jan 10, 2026
জাতীয় সরকার প্রশ্নে বিএনপি-জামায়াত কোন পথে? Jan 10, 2026
এবার মেক্সিকোতে হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের Jan 10, 2026
তারেক রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর নেতাকর্মীর আলহামদুলিল্লাহ পাঠ Jan 10, 2026
পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলার জবাবে লভিভে আঘাত হেনেছে রাশিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র Jan 10, 2026
মাচাদোর সঙ্গে শিগগিরই সাক্ষাৎ করবেন ট্রাম্প Jan 10, 2026
বেগম জিয়া সম্ভবত আমাকে সাংবাদিক হিসেবে পছন্দ করতেন: আইন উপদেষ্টা Jan 10, 2026
হা-দি ও স্বেচ্ছাসেবকদল নেতার ঘটনায় ইশরাকের মন্তব্য! Jan 10, 2026
যেভাবে দোয়া করলে কবুল হয় Jan 10, 2026
তেলের চেয়েও বড় চমক নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে ভেনেজুয়েলা Jan 10, 2026
তামিমকে ভারতীয় দা-লা-ল বললেন বিসিবি পরিচালক Jan 10, 2026
খালেদা জিয়ার দোয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন ডা. জুবাইদা রহমান Jan 10, 2026
নতুন সিজনে দর্শকের জন্য হাসি আর চমক Jan 10, 2026
img
ইরান সরকারের জন্য নতুন সতর্কবার্তা ট্রাম্পের Jan 10, 2026
বিসিবি পরিচালকের পোস্টে তোলপাড় দেশের ক্রিকেট Jan 10, 2026
img
বেগম জিয়া রাজনীতিতে কখনো প্রতিহিংসার চর্চা করেননি: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার Jan 10, 2026
img
রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার ২ তেলবাহী জাহাজ আটক যুক্তরাষ্ট্রের Jan 10, 2026
img
কুড়িগ্রামে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বহিষ্কার Jan 10, 2026
img
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল মোটরসাইকেল আরোহীর Jan 10, 2026
img
জকসু ও হল সংসদের নবনির্বাচিতদের নিয়ে প্রজ্ঞাপন Jan 10, 2026