কক্সবাজারের টেকনাফ হোয়াইক্যং সীমান্তে উপর্যুপরি মায়ানমার থেকে আসা গুলিতে বাংলাদেশি স্কুলছাত্রী ও জেলেসহ ২ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সীমান্তের এপারে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) সকালের ঘটনার পরপরই হোয়াইক্যং এলাকার স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনগণ কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে নেমে আসে। ক্ষুব্ধ জনতা সড়ক অবরোধ করে রাখে। সড়কে প্রায় তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকার পর কক্সবাজার-৪ আসনের বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত দুই সংসদ সদস্য প্রার্থীর চেষ্টায় জনগণ শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেয়।
পরে দুপুর দেড়টার দিকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয় জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে ৫০ জন চিহ্নিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীসহ ৫৩ জনকে বিজিবি আটক করেছে। আটকদের সন্ধ্যায় টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার থেকে টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল ও তেচ্ছিব্রিজ নামক সীমান্ত এলাকায় মায়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গাদের তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সংঘাত চলে আসছিল।
টানা তিনদিন ধরে উভয়পক্ষের গোলাগুলিতে নাফনদ তীরের স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাজনিত কারণে এক প্রকার গৃহবন্দি হয়ে দিন যাপন করেছে। এরই মধ্যে গত শুক্রবার মায়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আলমগীর নামের এক স্থানীয় জেলে গুলিবিদ্ধ হন। দ্বিতীয় দফায় রবিবার আরেকদফা গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয় স্থানীয় এলাকার আফনান (১০) নামের এক কিশোরী স্কুলছাত্রী।
মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় দুপক্ষের গোলাগুলিতে রবিবার সকালে গুলিবিদ্ধ কিশোরী স্কুল ছাত্রী নিহত হওয়ার কথা প্রচার হওয়ায় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে নেমে আসে টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে।
এলাকার লোকজন অবিলম্বে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে গ্রেপ্তারসহ ক্যাম্পে অবস্থানকারী সব রোহিঙ্গাকে মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে।
এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা বিজিবির একটি যানবাহনেও চড়াও হয়। জনতা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মহাসড়ক অবরোধ করে ফেলে। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজালাল দেশের একটি গণমাধ্যমকে জানান, স্থানীয় এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
মায়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গারা সবাই রাখাইনের বাসিন্দা। তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং বিবাদ-সংঘাত তাদের ভূখণ্ডে হলে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আমরা স্থানীয় বাসিন্দারা বার বার বিড়ম্বনার মুখে পড়ছি।
ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান শাহজালাল বলেন, নাফনদের বিলাসী দ্বীপসহ আরো তিনটি দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে বাংলাদেশের জলসীমানায়। ক্যাম্প থেকে এসব দ্বীপে গিয়ে রোহিঙ্গারা বাসা বেঁধে রয়েছে বহুদিন ধরে। রোহিঙ্গাদের বেশ কয়েকটি সংগঠনের সদস্যরা নাফনদের এসব দ্বীপে আস্তানা গেঁড়ে মায়ানমারে বাংলাদেশের খাদ্যসামগ্রী পাচার করে, বিনিময়ে নিয়ে আসে ইয়াবার চালান। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্রের চালানও পাচার করে থাকে। এসব কাজে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের কাছে ব্যবসার ভাগ দাবি করলে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় সংঘাতের ঘটনা। নাফনদের পশ্চিম তীরে এসময় অবস্থান নেয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা, আর নদের ওপারে থাকে আরাকান আর্মি। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে যখন আরাকান আর্মি গুলি ছোড়ে, সেই গুলিতে বিদ্ধ হয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরের জনগণ। স্থানীয়রা এমন দুর্বিষহ অবস্থার মুখে রয়েছেন মাসের পর মাস ধরে। গত তিন দিনের গোলাগুলিতে যখন উপর্যুপরি বাংলাদেশি জেলে ও স্কুল ছাত্রী গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তখনই এলাকাবাসী ক্ষীপ্ত হয়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়ে।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও এপিবিএন-এর একাধিক দল কাজ শুরু করে।
অপরদিকে, সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠলে কক্সবাজার-৪ উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনের আসন্ন নির্বাচনের বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মওলানা নূর আহমদ আনোয়ারী ঘটনাস্থলে ছুটে যান। দুই এমপি প্রার্থী সীমান্ত এলাকা শান্ত রাখার আশ্বাস দিয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেন। টানা তিন ঘণ্টা পর সড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
এ বিষয়ে এমপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী দেশের একটি গণমাধ্যমকে জানান, রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘদিনের সমস্যা। আমাদের দল বিএনপি যদি আসন্ন নির্বাচনে সরকার গঠন করে, তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মওলানা নূর আহমদ আনোয়ারীও প্রায় একই সুরে বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারাও এখন রোহিঙ্গাদের আর সহ্য করতে পারছে না। তাই দল যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে সমস্যাটির ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হবে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবির হেফাজতে থাকা ৫২ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে থানায় আনা হয়েছে। তাদের যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ওসি আরো জানান, গুলিবিদ্ধ কিশোরী স্কুলছাত্রীকে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম পাঠানো হয়েছে এবং গত শুক্রবারের গুলিবিদ্ধ জেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে।
টিজে/টিএ