শরীয়তপুরে শিশু শিক্ষার্থী ‘নিবিড়’ হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড

শরীয়তপুরে আলোচিত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিড় হত্যাকাণ্ডে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন আদালত, আরেকজনকে দেওয়া হয়েছে ২১ বছরের আটকাদেশ।

গতকাল শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর এজলাস থেকে বের করার সময় আসামিদের ওপর বিক্ষুব্ধ জনতা হামলার চেষ্টা চালালে পুলিশ তাদের রক্ষা করে।

আদালতের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিবিড়ের পরিবার। তবে রায়ে সঠিক বিচার মেলেনি উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দু্ই আসামি হলেন- শাকিল হোসেন গাজী (১৯) ও সিয়াম হোসেন (২০)। আরেক ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসামীকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বিকেলে খেলাধুলার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের খিলগাঁও এলাকার প্রবাসী মনির খান ও নিপা আক্তার দম্পতির ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিড়। সেদিন সন্ধ্যায় নিবিড়ের মা নিপা আক্তারের ফোনে কল করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। এ ঘটনায় সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার শাকিল হোসেন গাজী, পাবনার সিংঙ্গা এলাকার সিয়াম হোসেন ও খিলগাঁও এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে আটক করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সকালে বাড়ির অদূরে পরিত্যক্ত জমি থেকে উদ্ধার করা হয় নিবিড়ের মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ।

এ ঘটনায় নিহতের দাদা মমিন আলী খান বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আটক আসামিরা।

দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস পর ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে গতকাল শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান অভিযুক্ত শাকিল হোসেন গাজী ও সিয়াম হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড ও আরেক ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসামীকে ২১ বছরের আটকাদেশের রায় ঘোষণা করেন।

হৃদয় খান নিবিড়ের বাবা মনির হোসেন খান বলেন, আমি দীর্ঘদিন প্রবাসী ছিলাম। হত্যাকারীরা আমার ছেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণ দেওয়ার আগে তারা আমার ছেলেকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। পরে পুলিশ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনে। দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস পর আমার ছেলের হত্যার রায় আজকে দেওয়া হয়েছে। দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এতে আমরা খুশি। তবে আমাদের দাবি অতি দ্রুত যেন এই রায় কার্যকর করা হয়।

নিবিড়ে মা নিপা আক্তার বলেন, আমার ফুলের মতো শিশু ছিল। ওকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে আমি কখনই মানতে পারিনি। আমার ছেলেকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে অপরাধীদের যেন সেভাবে দ্রুত ফাঁসি দেওয়া হয়। আর যাকে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে তার ব্যাপারে আমরা সন্তুষ্ট নই, তাকেও ফাঁসি দেওয়া হোক।

বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান রোকন বলেন, আজকে আদালতে যেই ফাঁসির রায় দিয়েছে এতে আমার মক্কেল তার সঠিক রায় পেয়েছে। তবে যাকে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে তার ব্যাপারে বাদী পক্ষের সাথে কথা বলে আপিল করার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে রায়ে সঠিক বিচার পায়নি আসামিপক্ষ- এমন দাবি করে উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসতিয়াক আহম্মেদ বলেন, এই মামলার প্রতিটি পদে পদে ডিস্ট্রয় করা হয়েছে, প্রতিটি এভিডেন্স টেম্পারিং করা হয়েছে।

এদিকে আদালতের রায়কে সাধুবাদ জানিয়ে দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। শরীয়তপুর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল) কামরুল হাসান বলেন, বাদীর এজাহার, সাক্ষীদের সাক্ষী ও আসামিদের স্বীকারোক্তি হুবহু মিল থাকায় মহামান্য আদালত দুইজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও একজনের ২১ বছরের আটকাদেশ দিয়েছেন। আদালত এই রায়ের মাধ্যমে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। অতি দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হলে কোনো আসামি আর এ ধরনের অপরাধ করতে পারবে না।

আরআই/ এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
ইসিতে পঞ্চম দিনের আপিল শুনানি শুরু Jan 14, 2026
img
ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলল রাশিয়া Jan 14, 2026
img
ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন Jan 14, 2026
img
এনসিপির ইশতেহার বিষয়ক উপ-কমিটি গঠন, দায়িত্ব পেলেন কারা? Jan 14, 2026
img
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক Jan 14, 2026
img
সুইস প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশি দূতের পরিচয়পত্র পেশ Jan 14, 2026
img
ট্রাম্পের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে জাতিসংঘে চিঠি ইরানের Jan 14, 2026
img
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রির ঘরে Jan 14, 2026
img
বিশ্ববাজারে রেকর্ড দামে সোনা ও রুপা Jan 14, 2026
img
১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার ঘোষণা বুধবার, সিদ্ধান্তহীনতায় দুই দল Jan 14, 2026
img
বিশ্বের সপ্তম দুর্বল পাসপোর্ট বাংলাদেশের Jan 14, 2026
img
ঘন কুয়াশার কারণে নৌযান চলাচলে সতর্কতার নির্দেশ Jan 14, 2026
img
শেষ বলে ৬ হাঁকিয়ে রোমাঞ্চকর জয় এনে দিলেন রাজা Jan 14, 2026
img
মালয়েশিয়া প্রবাসীদের জন্য সুখবর Jan 14, 2026
img
কক্সবাজারে ৪ কোটি টাকার ইয়াবাসহ আটক ২ Jan 14, 2026
img
জকসুর প্রথম সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত Jan 14, 2026
img
মৌলভীবাজারে দ্বিতীয় জনসভা করবেন তারেক রহমান Jan 14, 2026
img
জিয়াউলের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হবে কি না, জানা যাবে আজ Jan 14, 2026
img
ইংল্যান্ড দলে মদ্যপানের অভিযোগ, সাবেক সতীর্থদের রক্ষার চেষ্টা ব্রডের Jan 14, 2026
img
ইরানে ১২০ ঘণ্টার বেশি ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট: ক্লাউডফ্লেয়ার Jan 14, 2026