খালেদা জিয়ার চিকিৎসার নথি জব্দ ও সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার দাবি ডা. এফ এম সিদ্দিকের

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এই অবহেলাকে ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ বলে অভিহিত করেন তিনি। তার মতে, এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এটি উনাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ছাড়াও উনার ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে আছে বলে তিনি জানান।

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত নথিপত্র আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে নাগরিক শোকসভায় চিকিৎসক সমাজের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক তার বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় চরম অবহেলার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "বিগত ২৭ এপ্রিল ২০২১ তারিখে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হবার পর আমরা, বর্তমান মেডিকেল বোর্ড, উনার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। আমাদের তত্ত্বাবধানে ভর্তির সাথে সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা অত্যন্ত বিস্ময় ও উদ্বেগের সাথে দেখতে পাই যে, ম্যাডাম লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত। অথচ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে উনাকে 'মেথোট্রেক্সেট' নামের একটি ট্যাবলেট আর্থ্রাইটিসের জন্য নিয়মিত খাবার নির্দেশ দেয়া আছে এবং উনাকে সেখানে ভর্তি থাকা অবস্থায়ও ওই ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিক এই ঔষধটি খাওয়ানো বন্ধ করি।"

তিনি আরও বলেন, "ম্যাডাম রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং রিউমাটলজিস্টদের পরামর্শে এই ওষুধটি খাচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি উনার ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ম্যাডামের লিভারের অসুখ নির্ণয় করা খুবই সহজ একটি কাজ ছিল, এর জন্য বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই। মেথোট্রেক্সেট খাওয়ালে নিয়মিত রক্তে লিভার ফাংশনের কয়েকটি উপাদান পরীক্ষা করে দেখতে হয় এবং অস্বাভাবিক হলে ঔষধ বন্ধ করে অন্তত পেটের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করে লিভারের অবস্থা দেখতে হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ম্যাডামের লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ দেখার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটা আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং ওষুধটিও বন্ধ করেননি।"

চিকিৎসকদের প্রতি অনাস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে ম্যাডাম সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি। তবে অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে তার আস্থাভাজন চিকিৎসক দিয়ে 'বেড সাইডে' সহজেই আল্ট্রাসাউন্ড করা যেতো। অন্তত ওই ওষুধটি বন্ধ করে দেয়া ছিল অবশ্য কর্তব্য।

অনেকেই বেগম খালেদা জিয়াকে 'স্লো পয়জন' করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্ন করেন উল্লেখ করে ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, "আমার উত্তর হচ্ছে— মেথোট্রেক্সেট ছিল সেই ওষুধ যা উনার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে লিভার সিরোসিসের দিকে ত্বরান্বিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে এটি উনার লিভারের জন্য 'স্লো পয়জন' হিসেবে কাজ করেছে।"

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এই অবহেলাকে 'ইচ্ছাকৃত অবহেলা' বলে অভিহিত করেন তিনি। তার মতে, এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এটি উনাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ছাড়াও উনার ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে আছে বলে তিনি জানান।
এই পরিস্থিতিতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানান ডা. এফ এম সিদ্দিক:

১. সরকার কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন দক্ষতার ভিত্তিতে তারা ম্যাডামের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর বর্তায় কি না।
২. ভর্তিকালীন সময় কোন কোন চিকিৎসক উনার চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
৩. মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে ম্যাডাম আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন কী কারণে সেটি হয়নি বা কারা বাধা দিয়েছিল।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, "সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ম্যাডামের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিএসএমএমইউর সমস্ত ডকুমেন্ট আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারেসরকারের পক্ষ থেকে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশা করি। কারণ আমরা জানি- জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড।"

শোকসভায় অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক আক্ষেপ করে বলেন, সারাজীবন গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকারের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এই মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি নিজের চোখে দেখে যেতে পারতেন যে মানুষ আজ নির্ভয়ে তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে।

এবি/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
প্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন, স্বাভাবিকের চেয়ে দিনের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি বেশি Jan 18, 2026
img
দেবীদ্বারে অটোরিকশাচালক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ Jan 18, 2026
img

আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ

টসের সময় ভুল বোঝাবুঝি, ম্যাচ শেষে হাত মেলালো বাংলাদেশ-ভারত Jan 18, 2026
img
দ্বৈত নাগরিক-ঋণ খেলাপিদের নির্বাচনে সুযোগ দিলে রাজপথে নামব: আসিফ মাহমুদ Jan 18, 2026
img
‘পেড্ডি’ ও ‘দ্য প্যারাডাইস’ নিয়ে নেই কোনো প্রচারণা, বাড়ছে নানান জল্পনা-কল্পনা Jan 18, 2026
img
ইন্টারনেট বন্ধ করে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, মুসোভেনিরের নিরঙ্কুশ জয় Jan 18, 2026
img
আল্লু অর্জুনের AA23 কাহিনি ফাঁস, নতুন সুপারহিরোর উত্থান! Jan 18, 2026
img
থামছেন না রজনীকান্ত, জেলার টু-এর পরেই নতুন ছবির প্রস্তুতি Jan 18, 2026
img
তুম্বাডের পর মায়াসভা নিয়ে ফিরছেন রাহি অনিল বারভে Jan 18, 2026
img
বাংলাদেশকে এবার সুখবর দিল কুয়েত Jan 18, 2026
img
চট্টগ্রামে ‘দুষ্কৃতকারী’ তালিকায় সাবেক মন্ত্রী-মেয়র, আ.লীগ-বিএনপি নেতা Jan 18, 2026
img
নেটফ্লিক্সে আসছে নানির বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘প্যারাডাইস’ Jan 18, 2026
img
উত্তেজনার মুখে এলাকাবাসীর ধাওয়া, বিপাকে রিপাবলিক বাংলার সাংবাদিক Jan 18, 2026
img
এবার ভারতের আরেকটি অঞ্চল নিজেদের দাবি করল চীন Jan 18, 2026
img
গাইবান্ধায় পাচারকালে ২০ বস্তা সার জব্দ Jan 18, 2026
img
তৃণমূলকে উচ্ছেদের সময় হয়ে গেছে: মোদি Jan 18, 2026
img
এবার খামেনি পতনের ডাক দিল ট্রাম্প! Jan 18, 2026
img
বাংলাদেশের সঙ্গে গ্রুপ পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান আয়ারল্যান্ডের Jan 18, 2026
img
নিজস্ব ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া আনছে ইরান Jan 18, 2026
img
রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে জুলাই ঐক্য নষ্ট করার ষড়যন্ত্র চলছে: নুরুল হক নুর Jan 18, 2026