যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় প্রতিনিধি দলের আশ্বাস, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কেরই থাকবে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘যেকোনো উপায়ে’ গ্রিনল্যান্ড দখলের অঙ্গীকারের পর গতকাল শুক্রবার ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন ক্যাপিটল হিলের আইনপ্রণেতাদের একটি দল। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ দলে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই পক্ষের আইনপ্রণেতারাই ছিলেন। বৈঠকে তাঁরা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে এই আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তাদের সমর্থন রয়েছে।

তবে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্ক এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এই বৈঠকের পরও তা সমাধানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়েছে এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

এমনকি প্রতিনিধিদলটি যখন ডেনমার্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, কোপেনহেগেন থেকে প্রায় দুই হাজার মাইল দূরে অবস্থিত আধা-স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়টি মেনে নিতে দেশগুলোকে চাপ দিতে তিনি শুল্ক আরোপের কথাও বিবেচনা করছেন।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বদানকারী ডেলওয়্যারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুন্স বলেন, ডেনমার্ক ‘ভালো এবং বিশ্বস্ত মিত্র ও অংশীদার’। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

এছাড়া ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে মার্কিন সেনাদের পাশে থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা এবং জীবন উৎসর্গ করা ডেনিশ সেনাদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে তাঁর এই মন্তব্যগুলো গত বছর দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। ভ্যান্স সে সময় বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডে পর্যাপ্ত সামরিক উপস্থিতি না থাকায় ডেনমার্ক ‘ভালো মিত্রের ভূমিকা পালন করছে না'।

যদিও সিনেটর কুন্স বলেন, গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে তিনি আইন প্রণয়নের পক্ষে থাকবেন, তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সফর ও বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সহকর্মীদের কথা শোনা এবং দ্বীপটির সম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা এবং পরিস্থিতির ‘উত্তেজনা প্রশমন’ করা।

প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন রিপাবলিকান সিনেটর আলাস্কার লিজ মারকোস্কি ও নর্থ ক্যারোলিনার থম টিলিস এবং মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি স্টেনি হোয়ার।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের আয়োজিত এক বৈঠকে সমঝোতা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং ডেনমার্কের প্রকাশ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টা পরই কোপেনহেগেনে পৌঁছায় এই মার্কিন প্রতিনিধিদল।

গত বুধবার হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্সে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্টের সঙ্গে বৈঠক শেষে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ড ‘দখল করার’ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘ইচ্ছা’ নিয়ে তাদের মধ্যে ‘মৌলিক মতভেদ’ থাকা সত্ত্বেও আলোচনা অব্যাহত রাখতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

ডেনিশ কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে এবং তারা কিছুটা সময় পেয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানান, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদল গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে ‘কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা’ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে।
এ বিষয়ে রাসমুসেন বলেন, বুধবারের বৈঠকে যে সমঝোতা হয়েছে, তার মূল কথা ছিল, ‘গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলায় কোনো যৌথ অগ্রগতির পথ খুঁজে পাওয়া যায় কি না, তা অনুসন্ধানের জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা।

ট্রাম্পের মতে, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের নিরাপত্তা হুমকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখতে যে ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনি গড়ে তুলতে চান, তার জন্যও এই দ্বীপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ডেনমার্ক, ন্যাটোভুক্ত মিত্র দেশগুলো এবং অধিকাংশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান চুক্তি এবং ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ডেনমার্কের অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রবেশাধিকার এরইমধ্যে আছে।

গ্রিনল্যান্ড কেনা বা ন্যাটোভুক্ত কোনো মিত্র দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার প্রসঙ্গে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের মার্কিন আইনপ্রণেতারাই বেশ উদ্বিগ্ন। কিছু রিপাবলিকান এই পরিকল্পনাকে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা জোট ও মিত্রতার সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়ার মতো গুরুতর কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন।

কেন্টাকির সিনেটর এবং সাবেক রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল এই সপ্তাহে সিনেটে কঠোর ভাষায় এর সমালোচনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের আলোচনা হোয়াইট হাউসকে একতরফাভাবে ‘বিশ্বস্ত মিত্রদের সঙ্গে কষ্টার্জিত আস্থা পুড়িয়ে ফেলতে’ বাধ্য করবে, অথচ এর বিনিময়ে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকারেও কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। ম্যাককনেলের ভাষায়, এটি হবে ‘কৌশলগত আত্মঘাতী পদক্ষেপ’।

উভয় দলের আইনপ্রণেতারা বলছেন, প্রেসিডেন্টের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করার আইন প্রণয়নের বিষয়ে সমর্থন দেবেন তাঁরা। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই বিতর্কটি ভেনেজুয়েলা এবং পশ্চিম গোলার্ধের অন্যত্র গৃহীত পদক্ষেপের ফলে সৃষ্ট যুদ্ধের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব নিয়ে চলা বৃহত্তর লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পপন্থী কিছু সোচ্চার আইনপ্রণেতা প্রশাসনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন।

ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি র‍্যান্ডি ফাইন গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার জন্য একটি বিল উত্থাপন করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, আর্কটিক অঞ্চলের নৌপরিবহন রুট ও প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা অন্য সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।

যদিও এই প্রস্তাব তেমন সমর্থন না পেলেও বিলটি দাখিলের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা র‍্যান্ডি ফাইনের দপ্তরে উপস্থিত হয়ে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয় এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রণ তারা মেনে নেবে না।

এসকে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
নীরবে ট্রাম্পের ওপর পাল্টা ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ভারতের Jan 17, 2026
img
সংকট কাটিয়ে নতুন অধ্যায়, সিনেমায় কণ্ঠ দিচ্ছেন দেবলীনা নন্দী Jan 17, 2026
img
জুলাইয়ে ওড়ানো সেই পতাকা তারেক রহমানকে উপহার দিলেন ছাত্রদলকর্মী Jan 17, 2026
img
আগামীকাল দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে ইসি Jan 17, 2026
img
টানা ১২ দিন ধরে তীব্র শীতে কাঁপছে পঞ্চগড় Jan 17, 2026
img
২২ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য হার Jan 17, 2026
img
তারেক রহমানের আসনে ৫৬ সদস্যের মিডিয়া কমিটি ঘোষণা বিএনপির Jan 17, 2026
img
বিক্ষোভে ‘হাজারো হত্যার’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত : খামেনি Jan 17, 2026
img
চট্টগ্রামকে ৩ উইকেটে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রাজশাহী Jan 17, 2026
ডন ৩ নিয়ে গুজবের ঝড়, অপেক্ষায় দর্শক Jan 17, 2026
img
বহিষ্কার করে এখন বলে মন্ত্রিত্ব দেব, আসনটা ছেড়ে দেন: রুমিন ফারহানা Jan 17, 2026
নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রস্তুতি: ঢাবিতে ডাকসুর বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি! Jan 17, 2026
যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তারেক রহমানের যে আলাপ হলো Jan 17, 2026
img
ইসিতে অষ্টম দিনের আপিল শুনানিতে ৪৫টি আবেদন মঞ্জুর Jan 17, 2026
img
ঝিনাইদহে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, আটক ৪ Jan 17, 2026
img
জাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব : ধর্ম উপদেষ্টা Jan 17, 2026
img
নগরীর প্রত্যেককে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা হবে: মেয়র শাহাদাত Jan 17, 2026
img
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সঙ্গে গ্রুপ বদলের প্রস্তাব নাকচ আয়ারল্যান্ডের Jan 17, 2026
img
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় প্রতিনিধি দলের আশ্বাস, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কেরই থাকবে Jan 17, 2026
img
তারেক রহমানের সঙ্গে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ Jan 17, 2026