ট্রাম্পের এই অবস্থান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্টারমার চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাভিলাষের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি ঠেকাতে ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে গ্রিনল্যান্ড নিতে চান।
শাগোস দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা মরিশাসের হাতে তুলে দিতে যুক্তরাজ্যের চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই দ্বীপপুঞ্জেই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়েছে। ট্রাম্প এই চুক্তিকে যুক্তরাজ্যের 'চরম দুর্বলতা' এবং 'মহা বোকামি' বলে অভিহিত করেছেন। গ্রিনল্যান্ড কেন তার চাই, সেটার কারণ হিসেবেও তিনি এই বিষয়টিকে সামনে এনেছেন।
গত বছর ওয়াশিংটন এই চুক্তিতে সায় দিয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করার কথা। তবে ৯৯ বছরের লিজের মাধ্যমে দিয়াগো গার্সিয়া ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাজ্যের হাতেই থাকার কথা ছিল।
কিন্তু ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক পোস্টে সেই অবস্থান পাল্টে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, 'হতবাক হওয়ার মতো বিষয়! আমাদের 'মেধাবী' ন্যাটো মিত্র যুক্তরাজ্য বর্তমানে দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপটি মরিশাসের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অথচ এখানেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সামরিক ঘাঁটি। আর তারা এটা করছে কোনো কারণ ছাড়াই।'
তিনি আরও লিখেছেন, 'এতে কোনো সন্দেহ নেই যে চীন ও রাশিয়া এই চরম দুর্বলতা লক্ষ্য করেছে... যুক্তরাজ্যের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জমি ছেড়ে দেওয়াটা 'মহা বোকামি'। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড কেন দখল করা দরকার, তার দীর্ঘ তালিকার আরেকটি কারণ হলো এই ঘটনা।'
ট্রাম্পের এই অবস্থান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্টারমার চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাভিলাষের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি ঠেকাতে ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে গ্রিনল্যান্ড নিতে চান।
শাগোস নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই চুক্তি করা হয়েছে। এক মুখপাত্র বলেন, 'আদালতের রায়ের কারণে দিয়াগো গার্সিয়া ঘাঁটিটি হুমকির মুখে ছিল। এতে আমাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং ভবিষ্যতে ঘাঁটির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি।'
৬০০টিরও বেশি দ্বীপের মধ্যে শাগোসের প্রধান ছয়টি অ্যাটল বা প্রবাল দ্বীপ মালদ্বীপের ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার ঠিক মাঝখানে এর অবস্থান। সেখানে প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিয়োজিত আছেন।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপে ঘাঁটি তৈরির জন্য যুক্তরাজ্য জোর করে ২ হাজার স্থানীয় শাগোসিয়ানকে উচ্ছেদ করেছিল। তবে এখন তারা সাবেক উপনিবেশ মরিশাসের হাতে এর সার্বভৌমত্ব তুলে দিয়েছে। ঘাঁটিটি নিরাপদ রাখতে যুক্তরাজ্য প্রতিবছর মরিশাসকে ১০ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার) দিচ্ছে।
ইয়েমেন থেকে আফগানিস্তান- হামলার কেন্দ্রবিন্দু এই ঘাঁটি
দিয়াগো গার্সিয়া থেকে সম্প্রতি ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়েছে (২০২৪ ও ২০২৫ সালে)। গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানো এবং ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ও আল-কায়েদার ওপর হামলার জন্যও এই ঘাঁটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
ব্রিটিশ জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ড্যারেন জোনস বলেছেন, শাগোস চুক্তিটি আগেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। এটি এখন কীভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব, তা তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য আসলে চুক্তি স্বাক্ষরে দেরি করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসন যেন পরিকল্পনাটি খতিয়ে দেখার সময় পায়। গত বছরের মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক অর্জনে তার সমর্থন জানিয়েছেন।'
স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি প্রথম নেতা হিসেবে কিছু শুল্ক কমানোর চুক্তিও করেছিলেন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মতবিরোধ এবং এখন শাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে উত্তেজনায় সেই সম্পর্কে ফাটল ধরেছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর সোমবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী শান্ত আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জোটের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অনুরোধ জানান।
মন্ত্রী জোনস বিবিসি রেডিওকে বলেন, ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো সামাল দিতে যুক্তরাজ্য কূটনৈতিক চ্যানেলের ওপরই জোর দেবে। তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী দেখিয়ে দিয়েছেন যে ব্যক্তিগত ও সঠিক ব্রিটিশ কূটনীতি কার্যকর হতে পারে।'
এদিকে ব্রিটেনের বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক শাগোস ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই 'ভয়াবহ' চুক্তি যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে।
এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'টাকা দিয়ে শাগোস দ্বীপপুঞ্জ সমর্পণ করা শুধু বোকামিই নয়, এটি পুরোপুরি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।' তিনি আরও বলেন, 'দুর্ভাগ্যবশত এই ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই সঠিক।'
কিছু শাগোসিয়ানও এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। দ্বীপপুঞ্জ থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর তাদের অনেকেই এখন ব্রিটেনে বসবাস করছেন। তাদের অভিযোগ, এই চুক্তির বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।
এমআই/এসএন