ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভের পর ‘ফেরার আর কোনও পথ নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক শাহেসাবেক শাহের স্ত্রী ফারাহ পাহলভি। বুধবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফারাহ পাহলভি বলেছেন, তিনি নিশ্চিত, শেষ পর্যন্ত ইরানের জনগণই ‘বিজয়ী’ হবেন।
১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে যে গণবিপ্লব সংঘটিত হয়, সেই সময় স্বামীর সঙ্গে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন ফারাহ পাহলভি। এএফপিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার ‘ইচ্ছা’ এবং ‘আজকের প্রয়োজন’ হলো ইরানে ফিরে যাওয়া।
ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। এরপর সেই বিক্ষোভ দাবানলের মতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ৮ জানুয়ারি। ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য এই বিক্ষোভ ব্যাপক চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়।
পরে ব্যাপক সহিংস দমন-পীড়ন চালিয়ে বিক্ষোভ দমন করে ইরানের সামরিক বাহিনী। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, বিক্ষোভে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এএফপিকে দেওয়া ইরানের সাবেক শাহের স্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিচে তুলে ধরা হলো :
• প্রশ্ন : দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর ইরানের জনগণের উদ্দেশে আপনি কী বার্তা দিতে চান?
ফারাহ পাহলভি : আমি ইরানি তরুণদের বলতে চাই, আজ তোমরা অপরিসীম সাহস নিয়ে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লিখছ... ইরানের জন্য এবং বিশ্বের জন্য। আশা ও বিশ্বাস ধরে রাখো, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তোমরাই বিজয়ী হবে। ইরানের আমার সন্তানদের- কন্যা ও পুত্রদের, বোন ও ভাইদের, ইরানের মহান তরুণদের মা–বাবাদের প্রতি আমি আমার গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
• প্রশ্ন : বিক্ষোভ দমন সত্ত্বেও কি আপনার এখনও আশা আছে?
ফারাহ পাহলভি : এসব মর্যাদাবান ও সাহসী তরুণদের মধ্যে হাজারো মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। আমাদের ইরান আবারও স্বাধীন দেশ হওয়ার আগে এই অপরাধী শাসনের হাতে আরও কতজন প্রাণ হারাবেন, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন।
একটি বিষয় এখন নিশ্চিত : ফেরার আর কোনো পথ নেই। এই পথ একমুখী; এটি স্বাধীনতার দিকে যায়-এবং প্রতিদিনই তা করুণভাবে এই দেশের কন্যা ও পুত্রদের রক্তে ভিজে যাচ্ছে। এমন আত্মত্যাগ বিজয় দাবি করে।
এই বিজয় শুধু আমার দেশের বিজয় হবে না, এটি বিশ্বে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতারও বিজয় হবে।
• প্রশ্ন : এখন বিরোধীপক্ষের ভূমিকা কী, যার অংশ আপনি নিজেও?
ফারাহ পাহলভি : আজ ইরানের বাইরে থাকা শাসনবিরোধীদের দুটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে। দেশের ভেতরের ইরানিদের সঙ্গে মুক্ত বিশ্বের জনগণ ও সরকারগুলোর একটি শক্তিশালী সংযোগ নিশ্চিত করা এবং নিজেদের স্বদেশিদের প্রতি সংহতি জানাতে আরও বৃহৎ বিক্ষোভ সংগঠিত করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জনমতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, সভ্যতার আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত একটি দেশে আসলে কী ঘটছে।
• প্রশ্ন : আপনি কি ইরানে বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ চান, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে*
ফারাহ পাহলভি : এই জনগণের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আমি সারা বিশ্বের বিবেকের কাছে আবেদন জানাই, তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখতে। সাধারণ উদাসীনতার মধ্যে হাজার হাজার ইরানির জীবন যেন হারিয়ে না যায়। এই গভীরভাবে অসম সংগ্রামে তাদের জয়ের সম্ভাবনা জোরদার করার অর্থ হলো তাদের বিজয় এবং একটি গণতান্ত্রিক ইরানের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলটি আরও শান্তিপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হবে।
• প্রশ্ন : ধর্মীয় নেতৃত্বের পতন হলে আপনার ছেলে রেজা পাহলভির জন্য আপনি কী ভূমিকা দেখছেন?
ফারাহ পাহলভি : তার ভূমিকা ঠিক সেটাই হবে, যা ইরানের জনগণ তাকে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেবে। আমার ছেলে, যার নাম প্রতিটি বিক্ষোভে ধ্বনিত হয়, তার জীবনের পুরোটা সময়েই বলে এসেছে, ইরানের জনগণই স্বাধীনভাবে তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সে নিজেও নিজের ভূমিকাকে কেবল তরুণ ইরানিদের মুখপাত্র হিসেবে দেখে, স্বাধীনতার দিনটি আসা পর্যন্ত।
• প্রশ্ন : সে ক্ষেত্রে, আপনি কি ইরানে ফিরে যাবেন?
ফারাহ পাহলভি : ৪৭ বছর ধরে আমি ইরানের স্বাধীনতা কামনা করেছি এবং অপেক্ষা করেছি। গভীর স্নেহে ইরানের জনগণ আমাকে ‘ইরানের মা’ বলে ডাকে। সংকটের সময়ে প্রতিটি মা ও প্রতিটি সন্তানের একসঙ্গে থাকা প্রয়োজন। আজ আমার ইচ্ছা এবং আমার প্রয়োজন-ইরানে ফিরে যাওয়া এবং এই অসাধারণ সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরা।
যেকোনো মায়ের মতো, যে তার সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন, আমি গভীরভাবে অনুভব করি এই যাত্রা এবং এই পুনর্মিলন খুব শিগগিরই ঘটবে।
সূত্র: এএফপি।
আরআই/টিএ