তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, সুইজারল্যান্ডের চারটি সরকারি ভাষার মধ্যে জার্মান ভাষাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে। মূলত ব্রাসেলস থেকে বার্লিন কিংবা প্যারিস-ইউরোপের অনেকের কাছেই ট্রাম্পের এই বক্তব্য অপমানজনক, উদ্ধত এবং তথ্যগতভাবে ভুল বলে মনে হয়েছে।
'যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে আপনারা সবাই এখন জার্মান ভাষায় কথা বলতেন'- বুধবার সুইস আল্পসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর বিবিসি'র।
তবে তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, সুইজারল্যান্ডের চারটি সরকারি ভাষার মধ্যে জার্মান ভাষাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে। মূলত ব্রাসেলস থেকে বার্লিন কিংবা প্যারিস-ইউরোপের অনেকের কাছেই ট্রাম্পের এই বক্তব্য অপমানজনক, উদ্ধত এবং তথ্যগতভাবে ভুল বলে মনে হয়েছে।
বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইউরোপ ভুল পথে এগোচ্ছে। ট্রাম্প প্রায়ই এ ধরনের মন্তব্য করে থাকেন। তবে ইউরোপের মাটিতে দাঁড়িয়ে বন্ধু ও মিত্রদের মুখের সামনে এমন কথা বলার প্রভাব ছিল ভিন্ন।
দাভোসের ফোরামে গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়ায় ইউরোপজুড়ে নিঃসন্দেহে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। তবে তিনি যদি কথাটি রাখেনও, তাতেও মূল সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। কারণ তিনি এমন এক ভূখণ্ড চাইছেন, যার মালিকরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন-এটি বিক্রির জন্য নয়।
এসবের পরও ফোরাম শেষে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, আর্কটিক অঞ্চলে তার আকাঙ্ক্ষায় বাধা দেওয়া আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর যে শুল্ক আরোপের হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, তা তিনি তুলে নিচ্ছেন।
তিনি দাবি করেন, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুত্তের সঙ্গে বৈঠকের পর গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক ইস্যুতে তিনি 'একটি চুক্তির কাঠামো' তৈরি করেছেন।
তবে গ্রিনল্যান্ডের পূর্ণ মালিকানা পাওয়ার যে ইচ্ছা ট্রাম্প পোষণ করেন, প্রস্তাবিত এই কাঠামোতে তা কীভাবে পূরণ হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই।
প্রস্তাবিত এই ১০ শতাংশ শুল্ক ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেওয়ার আগেই কোপেনহেগেনে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সাংবাদিকদের বলেন, 'তার বক্তব্যের পর একটি বিষয় পরিষ্কার-প্রেসিডেন্টের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট আছে।'
তিনি বলেন, সামরিক শক্তি ব্যবহার না করার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যটি 'আলাদাভাবে দেখলে ইতিবাচক'।
দাভোস থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকে সরকারি কর্মকর্তারা একটি 'নির্দেশিকা' প্রকাশ করেছেন। এতে ভূখণ্ডটিতে কোনো 'সংকট' দেখা দিলে বাসিন্দাদের কী করতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বনির্ভরতা বিষয়ক মন্ত্রী পিটার বর্গ বলেন, এই নথিটি অনেকটা 'বীমা পলিসি বা আগাম সতর্কতার' মতো। তবে তিনি জানান, গ্রিনল্যান্ড সরকার আশা করছে, এটি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না।
ইউরোপে আশা করা হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আটলান্টিকপারের এই সংকট কিছুটা হলেও প্রশমিত করবেন। তবে গ্রিনল্যান্ড দখলের পক্ষে তার অনড় যুক্তিগুলো তুলে ধরতে শুরু করায় সেই আশা দ্রুতই ভেঙে পড়ে।
গ্রিনল্যান্ড যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সার্বভৌম ভূখণ্ড-ইউরোপের এই জোরালো দাবিকে তিনি পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। বরং দখল প্রক্রিয়াটিকে তিনি একটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক লেনদেন হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে যে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, তার প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড দাবি করা ন্যায্য।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তা 'ফেরত দিয়ে' যুক্তরাষ্ট্র ভুল করেছিল।
যদিও বাস্তবতা হলো, গ্রিনল্যান্ড কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল না।
এ সময় ট্রাম্প তার পুরোনো অভিযোগও আবার তুলে ধরেন। তার দাবি, ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুই করেনি।
বিশেষ করে ডেনমার্ককে তাচ্ছিল্য করে কথা বলেন তিনি। ১৯৪০ সালের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, 'মাত্র ছয় ঘণ্টার লড়াইয়ে তারা জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল এবং নিজেদের কিংবা গ্রিনল্যান্ড-কাউকেই রক্ষা করতে পারেনি।'
১ ঘণ্টা ১২ মিনিটের দীর্ঘ বক্তৃতার শুরুতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গর্ব করে বলেন, দেশে 'মানুষ আমার ওপর খুব খুশি'।
তবে ট্রাম্পের গণতন্ত্রের এই সর্বশেষ চিত্র দেখার পর ইউরোপে এমন মনোভাব খুঁজে পাওয়া কঠিন। অথচ প্রেসিডেন্টের দাবি, তিনি ইউরোপকে 'খুব ভালোবাসেন'।
টিজে/টিএ