খড়গপুরের বিজেপি বিধায়ক ও খড়গপুর পুরসভার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা হলো। প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ না করেই দ্বিতীয়বার বিয়ে করার অভিযোগে ইতিমধ্যেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। বুধবার রাতে আনন্দপুর থানায় অনিন্দিতা ও তাঁদের কন্যা নিয়াসা চট্টোপাধ্যায়ের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআইআর নথিভুক্ত হয়। সেই এফআইআরের পর এবার ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বধূ নির্যাতন, বিশ্বাসভঙ্গসহ মোট তিনটি ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, হিন্দু বিবাহ আইন ১৯৫৫ অনুযায়ী প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় এবং আইনি বিচ্ছেদ ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে আইনত অপরাধ। এই ধারায় দোষ প্রমাণ হলে অভিযুক্তের কারাদণ্ডও হতে পারে। ফলে হিরণের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন আর শুধু বিনোদন জগতের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দিন কয়েক ধরে সামাজিক মাধ্যমে হিরণের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। একদিকে প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা, অন্যদিকে সদ্য বিবাহিতা ঋতিকা গিরি—দু’জনের বক্তব্য ও পরোক্ষ পাল্টাপাল্টি ইঙ্গিত ঘিরে উত্তাপ বাড়ে। যদিও এত বিতর্কের মাঝেও এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি হিরণ চট্টোপাধ্যায়। প্রথম স্ত্রীর আইনি পদক্ষেপের পরও তাঁর নীরবতাই নানা প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমে সতীনের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া পোস্ট ইতিমধ্যেই সরিয়ে ফেলেছেন ঋতিকা গিরি।
মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিজেপির এই তারকা বিধায়কের দ্বিতীয় দাম্পত্য জীবন নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এর আগেই শোনা গিয়েছিল, হিরণের জীবনে নতুন সম্পর্কে জড়ানোর গুঞ্জন। তখন তাঁর পাশে দেখা গিয়েছিল খড়গপুরের এক স্থানীয় বাসিন্দা এক নারীকেও। তবে নিজের থেকে বয়সে প্রায় আটাশ বছরের ছোট এক আপ্তসহায়কের সঙ্গে যে তিনি বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হবেন, তা প্রকাশ্যে আসতেই সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় হিরণের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি জানান, বহু বছর ধরেই একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর অভ্যাস ছিল হিরণের। একবার হিরণের শরীর খারাপ থাকায় না জানিয়ে খড়গপুরের বাড়িতে গেলে ঋতিকা তাঁকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। সেই সময় থেকেই তাঁর সন্দেহ আরও গভীর হয়। যদিও তখন হিরণ দাবি করেছিলেন, ঋতিকার মায়ের জন্মদিন থাকায় তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতে হয়েছে।
অনিন্দিতার অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তাঁর দাবি, একাধিকবার হিরণ তাঁকে জানিয়েছিলেন যে ঋতিকা আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছেন এবং একবার ছুরি নিয়ে আক্রমণ করতেও এসেছিলেন। পঁচিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে মানসিক নির্যাতনের কথাও প্রকাশ্যে এনেছেন অনিন্দিতা। সেই দীর্ঘ দিনের মানসিক যন্ত্রণা ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতেই এবার বিশ্বাসভঙ্গ ও বধূ নির্যাতনের মামলা দায়ের হলো হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে।
বুধবার আনন্দপুর থানার বাইরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অনিন্দিতা বলেন, আগে আইনি বিচ্ছেদ হোক, তারপর যত খুশি বিয়ে করুন। তিনি আরও কটাক্ষ করে বলেন, বিয়ের আগে যিনি বারবার আত্মহত্যার কথা বলতেন, তিনি সংসারজীবনে কতটা সুখী হবেন, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। ওই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কন্যা নিয়াসা। নিয়াসার অভিযোগ, ঋতিকা গিরি তাঁকে একাধিকবার ফোন করে ও বার্তা পাঠিয়ে আত্মহত্যার কথা জানিয়েছিলেন।
এই সমস্ত অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপে হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবন এখন জনসমক্ষে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে। তদন্ত এগোলে এই মামলায় নতুন কোন তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের।
কেএন/টিকে