আসন্ন নির্বাচন আদর্শিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের: গোলাম পরওয়ার

খুলনা-৫ আসনের ১০ দলীয় জোট প্রার্থী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অস্ত্রের যুদ্ধের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা ও আইন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এটিই বর্তমান সময়ের সংগ্রামের পথ।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে খুলনার আরাফাত এলাকায় আয়োজিত এক নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

বক্তব্যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একত্র করে তিনি আসন্ন নির্বাচনকে একটি আদর্শিক লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেন।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগের নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, মক্কার কুরাইশদের অত্যাচারের মধ্যেও নবী মুহাম্মদ (সা.) দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে সরে যাননি।

তিনি দাবি করেন, ইসলাম কেবল নামাজ, রোজা, ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। শহীদ প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, যারা আল্লাহর পথে জীবন দেন, তারা মৃত নন, তারা জীবিত এবং আল্লাহর কাছে রিজিকপ্রাপ্ত। দ্বীনের পথে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ।

নির্বাচনি রাজনীতি প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আগে যুদ্ধ হতো তরবারি, তীর-ধনুক ও কামান দিয়ে, এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালট দিয়ে। তিনি বলেন, সহিংসতা, সন্ত্রাস ও জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল ইসলাম সমর্থন করে না এবং জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই রাষ্ট্র ও সরকার পরিবর্তনের পক্ষে।

তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে পাঁচটি ইসলামী দল, জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, যারা রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারকে বিদায় দেওয়ার জন্য পেটোয়া বাহিনীর গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। বুকের মধ্যে তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর। এমন সাহস নিয়ে আবু সাঈদসহ যারা জীবন দিয়েছিল, সেই জুলাই যোদ্ধারা, সেই তরুণরা একটা দল গঠন করেছে। সেটা হচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারাও এই ১০ দলের মধ্যে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের বীর বিক্রম কর্নেল অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন দলসহ মোট ১০টি দল একত্র হয়ে জোট গঠন করেছে। এই জোটে ইসলামী চেতনা, জুলাই আন্দোলনের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমন্বয় ঘটেছে।

তিনি জানান, ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য জোটের মধ্যে আসন বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে এবং খুলনা-৫ আসনে জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকেই প্রার্থী করা হয়েছে। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সাহস পেলে আমি দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে নিতে প্রস্তুত।

বক্তব্যে তিনি বলেন, সৎ লোক নির্বাচিত হলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দমন-পীড়ন বন্ধ হবে বলেই কিছু মহল জামায়াতের বিরোধিতা করছে। একটি বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশে জামায়াতকে কুফুরি আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৭১ সালের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক দল পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, যা রাজনৈতিক মতপার্থক্য হতে পারে, কিন্তু অপরাধ নয়। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং জামায়াতের গঠনতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ নেই। বরং তিনি বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তোলেন।

দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে যারা দেশ শাসন করেছে, তাদের কেউই দুর্নীতিমুক্ত শাসনের দাবি করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে একযোগে দায়ী করে তিনি বলেন, প্রত্যেক সরকারের আমলেই দুর্নীতি, দলীয়করণ ও বিরোধী দমননীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভোট কেনার জন্য দেওয়া কালো টাকা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। টাকা দিয়ে মানুষের বিবেক কেনা যায় না এবং ভোট বিক্রি করা মানে ভবিষ্যৎ বিক্রি করা। ভোট কেনার উদ্দেশে দেওয়া আর্থ-সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার পরামর্শও দেন তিনি।

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ। তার ভাষায়, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে হলে পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন অপরিহার্য। তিনি দাবি করেন, ১০ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হবে।

সমাবেশ শেষে তিনি উপস্থিত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসন্ন নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং আদর্শিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি সন্ধিক্ষণ।

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন খুলনা জেলা জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, হরিণটানা থানা কর্মপরিষদ সদস্য লিখন হোসেন, মতিউর রহমান, আব্দুর রশীদ মল্লিক, শহিদুল ইসলাম, ডা. ইলিয়াস হোসেন, তাজুল ইসলাম, আমির হোসাইন, সালাউদ্দিন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাসেল গাজী, রফিকুল ইসলাম, মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ, আবু মুহসীন প্রমুখ।

এসকে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
ফাইনাল ম্যাচে ২৯ বলে অর্ধশত পূরণ তানজিদ তামিমের Jan 23, 2026
img
দণ্ডপ্রাপ্ত ২ খুনির জেলে প্রেম, বিয়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি Jan 23, 2026
img
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি : ড. মোশাররফ Jan 23, 2026
img
খেলাধুলার অবস্থা তলানিতে: মির্জা আব্বাস Jan 23, 2026
চিরযৌবনা জয়ার ঝলকে মুগ্ধ নেটদুনিয়া Jan 23, 2026
‘মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু’ নিয়ে তুমুল উন্মাদনা Jan 23, 2026
img
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আবু তাহের আর নেই Jan 23, 2026
img
চাঁদাবাজি রুখতে ব্যবসায়ীদের পাশে থাকব: এনসিপি নেতা আদীব Jan 23, 2026
img
মালয়েশিয়ায় সিগারেটের অবশিষ্টাংশ রাস্তায় ফেলায় কাঠগড়ায় বাংলাদেশি Jan 23, 2026
img
ফাঁস হওয়া প্রশ্নে ৭ কলেজে পরীক্ষা, তদন্ত কমিটি গঠন Jan 23, 2026
img
শূন্য থেকে ৫ বছরের সব শিশুর বিনা পয়সায় চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি জামায়াত আমিরের Jan 23, 2026
img
তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাব, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরব : মনজুরুল করিম রনি Jan 23, 2026
img
শোচনীয় পরাজয়ে সিডনির কাছে রিশাদের হোবার্টের বিদায় Jan 23, 2026
img
এমন সরকার চাই যেখানে গায়ের জোরে দেশ চলবে না: মান্না Jan 23, 2026
img
অপ্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার না করার পরামর্শ জয়া আহসানের Jan 23, 2026
img
ড্যাপের বিধি ভঙ্গ করলে জেল-জরিমানা Jan 23, 2026
img
রানির কণ্ঠস্বর নিয়ে প্রযোজকের আপত্তি থাকলেও সিদ্ধান্তে অনঢ় ছিলো করণ জোহর Jan 23, 2026
img
বিশ্বকাপ ইস্যুতে আইসিসিকেই দায়ী করলেন ফারুকী Jan 23, 2026
img
ব্যাংক লুটের চেয়ে ভোট ভিক্ষা উত্তম : হাসনাত আব্দুল্লাহ Jan 23, 2026
img
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ সতর্কতা জারি Jan 23, 2026