গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ

জাতীয় সংসদকে কোটিপতি, দুর্বৃত্ত ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব নয়, গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’। যুক্তফ্রন্ট অঙ্গীকার করেছে, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ৯০ ও ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন তথা সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবে।

আজ শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। লিখিত ইশতেহার পাঠ করেন যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রাগিব আহসান মুন্না, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবার কবীর জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুন নুজহাত মনীষা, সোনার বাংলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হারুন অর রশীদ প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেভাবে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে এবং গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কারগুলোকে চারটি প্রশ্নের একটি প্যাকেজে এনে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। এই গণভোটে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়নি। এতে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটবে না।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে জুলাই সনদের ঐকমত্যের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করলেও ভিন্নমতের বিষয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করবে।

উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। সিপিবি, বাসদসহ গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের অংশীদার দলগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় যোগ দিলেও জুলাই সনদে সই করেনি।

গণভোটের আয়োজন অসাংবিধানিক দাবি করে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, জুলাই সনদে ৮ মাসের আলোচনা ও নোট অব ডিসেন্টের মর্মবস্তু প্রতিফলিত হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসও সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। রাষ্ট্রের চার মূলনীতি বহাল রাখার প্রস্তাব মানা হয়নি। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার এবং এ নিয়ে আদালতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।

তিনি আরো বলেন, জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিগত তিনটি নির্বাচনে কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না।

গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের শাসন নিশ্চিত করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকার এখনো সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারেও দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নাই। ইতিমধ্যে বিভিন্ন বড় দলের সবল প্রার্থীরা প্রকাশ্যে আচরণবিধি লংঘন করে চলছে। স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক দল নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার করে বেহেস্তের টিকিট বিক্রি করছে , যা আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, খোদ প্রধান উপদেষ্টা যখন তার বক্তব্যে ‘একটি দলের কয়েকজন পাস করবে এবং তাদের দুই-একজন মন্ত্রীও হবেন’ এমন কথা বলেন তথা আগাম ভোটের ফলাফল বলে দেন এবং তার প্রেস সচিব যখন বলেন, ‘এবার ভোট গণনায় সময় বেশি লাগবে’ তখন সুষ্ঠু ভোট নিয়ে জনমনে সন্দেহ-অবিশ্বাস জন্ম নিতে বাধ্য।

অভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে দাবি করে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, মাজার, খানকাহ, আখড়া-মন্দিরে ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ চলেছে। গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও নারীদের ওপর হামলা ও সাইবার বুলিং প্রমাণ করছে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান হয়নি। বরং মব সন্ত্রাস ফ্যাসিবাদকে উসকে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের চরিত্র অপরিবর্তিত থাকায় মানুষ আবারও মুক্তির পথ খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের জন্য জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই বলেই বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি মিলিত হয়ে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করেছে।

এদিকে নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮টি বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। এর মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন, স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার ও প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস, শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার গণমুখী সংস্কার, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি সংস্কার, শ্রমিক অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন স্বাধীনতা, নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা, যুবশক্তির বিকাশ, পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো, পরিবেশ, জলবায়ুও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্ত ও গবেষণার গণমুখী সংস্কার, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা এবং পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সংহতি।

টিজে/টিকে 


Share this news on:

সর্বশেষ

img
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে কেএমপি কমিশনারের মতবিনিময় Jan 23, 2026
img
এবার নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলা করবেন ট্রাম্প! Jan 23, 2026
img
যশোরে জাতীয় পার্টির নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াতের মিছিল থেকে হামলার অভিযোগ Jan 23, 2026
img
বৈষম্যমুক্ত বরিশাল গড়তে ইসলামী মূল্যবোধের বিকল্প নেই: ফয়জুল করিম Jan 23, 2026
img
নারায়ণগঞ্জে ২১ কোটি টাকার ভারতীয় শাড়িসহ আটক ১ Jan 23, 2026
বিবাহবার্ষিকীতে উন্মুক্ত অক্ষয়–টুইঙ্কেলের কাণ্ড Jan 23, 2026
গণরুমবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চান জামায়াত আমির Jan 23, 2026
img
আ.লীগ মেইড ইন ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ায় রপ্তানি হয়ে গেছে: সালাহউদ্দিন আহমদ Jan 23, 2026
img
বিএনপির এক বড় নেতা ফোন করে বলেছেন- 'হজরত, দরজা খোলা': চরমোনাই পীর Jan 23, 2026
img
২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১১ Jan 23, 2026
img
আমরা ছাড়া দেশটাকে কেউ এগিয়ে নিতে পারবে না: মির্জা ফখরুল Jan 23, 2026
img
বাংলাদেশের পরিবর্তে বিশ্বকাপ খেলার প্রসঙ্গে নীরবতা ভাঙলো স্কটল্যান্ড! Jan 23, 2026
img
বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের বেকার সমস্যা দূর করবে: সালাউদ্দিন টুকু Jan 23, 2026
img
বিপিএলে সেরা ব্যাটার-বোলার কারা Jan 23, 2026
img

জামায়াত আমির

দুর্নীতি করা যাবে না, করতে দেওয়াও হবে না Jan 23, 2026
আদম আ:যেভাবে ক্ষমা পেয়েছিলেন | ইসলামিক জ্ঞান Jan 23, 2026
img
উত্তেজনাহীন ফাইনালে চট্টগ্রামকে হারিয়ে বিপিএলের শিরোপা পেলো রাজশাহী Jan 23, 2026
img
হাসিনা আপার রেখে যাওয়া সমর্থকদের পাশে আছি: মির্জা ফখরুল Jan 23, 2026
img
১০ দলীয় জোট বিজয়ী হলে সুশাসন নিশ্চিত করা হবে : আসিফ মাহমুদ Jan 23, 2026
img
ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে গোপন তৎপরতা চালায় যুক্তরাষ্ট্র Jan 23, 2026