ঝলমলে জীবন, অঢেল সম্পদ আর সীমাহীন ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ অন্ধকার জগৎ। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথি সামনে আসার পর সেই অন্ধকারের পর্দা একে একে সরে যাচ্ছে। এপস্টিন ফাইলস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও প্রশ্নের ঝড়।
প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে রাজনীতি, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও বিনোদন জগতের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ইলন মাস্ক ও বিল গেটস—তালিকাটি দীর্ঘ। বিস্ময় আরও বাড়িয়েছে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এবং পপ সংগীতের কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসনের নাম।
যদিও হকিং কিংবা জ্যাকসনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপ ও প্রাসাদে তাদের উপস্থিতির তথ্য জনমনে নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই ক্ষমতাবানদের নেটওয়ার্ক আসলে কতটা গভীর ছিল।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র সিরিজ ‘জেফরি এপস্টিন ফিলথি রিচ’-এ। এখানে কথা বলেছেন সেই নারীরা, যারা একসময় এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাদের বর্ণনায় প্রকাশ পেয়েছে অর্থ ও প্রভাবের দাপটে কীভাবে অল্প বয়সী মেয়েদের মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং ধীরে ধীরে তাদের ঠেলে দেওয়া হতো ভয়ংকর এক জালে। বিচার এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল, ক্ষমতার অপব্যবহার আর সংগঠিত অপরাধের নির্মম চিত্র এই সিরিজকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এপস্টিন ফাইলস প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্ট্যানলি কুবরিকের শেষ চলচ্চিত্র ‘আইজ ওয়াইড শাট’। চলচ্চিত্রটিতে অভিজাত শ্রেণির এক গোপন জগতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, যেখানে মুখোশধারী উচ্চবিত্তরা লিপ্ত থাকে বিকৃত যৌন আচার-আচরণে। সিনেমাটি মুক্তির কয়েক দিন আগেই কুবরিকের আকস্মিক মৃত্যু এবং ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে ফেলার গুঞ্জন আজও রহস্যের জন্ম দেয়। অনেকের মতে, এপস্টিনের দ্বীপের বাস্তব ঘটনাই যেন সেই সিনেমার অস্বস্তিকর প্রতিফলন।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে গ্যাব্রিয়েলা রিকো জিমেনেজের ঘটনা। ২০০৯ সালে মেক্সিকোর মন্টেরিতে এক হোটেলের সামনে ২১ বছর বয়সী এই তরুণী চিৎকার করে দাবি করেছিলেন, প্রভাবশালীরা মানুষ ও শিশুদের খাচ্ছে। ক্ষমতাবান কিছু পরিবারের নাম উচ্চারণ করার পর তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা করা হয়। এরপর রহস্যজনকভাবে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। আজ এপস্টিন কাণ্ড সামনে আসার পর সেই ঘটনাও অনেকের কাছে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।
একই ধরনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন দর্শকরা আরেক জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দ্য ইনোসেন্ট’-এ। সেখানে এলিট শ্রেণির গোপন যৌন নেটওয়ার্ক, নজরদারি ও বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চিত্র বাস্তব দুনিয়ার সঙ্গে অস্বাভাবিক সাদৃশ্য তৈরি করেছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
সব মিলিয়ে এপস্টিন কাণ্ড শুধু একজন অপরাধীর গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, প্রভাব ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা কি সত্যিই আইনের ঊর্ধ্বে, নাকি সত্য কেবল সময়ের অপেক্ষায় থাকে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বজুড়ে।
এসএন