চট্টগ্রাম বন্দরে নজিরবিহীন অচলাবস্থা, বন্ধ আমদানি-রপ্তানি

চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান লাগাতার কর্মবিরতি ও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতিকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ‘মহাবিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ ও বিজিবিএ।

বিবৃতিতে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বন্দর একদিন বন্ধ থাকলেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়। চলমান অচলাবস্থায় তৈরি পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পের আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দেশকে অপূরণীয় ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, একদিকে কারখানাগুলোর কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য বন্দরে আটকে থেকে শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেওয়া ‘ডেডলাইন’ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি আরো কয়েকদিন বজায় থাকলে বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বাতিলের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং প্রত্যাহারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তারা আরো বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাত ইতিমধ্যে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।

উদ্যোক্তারা প্রাণান্তকর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে বন্দরের অচলাবস্থার কারণে ভয়াবহ কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে। এতে ডেমারেজ, পোর্ট চার্জ ও স্টোরেজ রেন্ট বেড়ে গিয়ে উৎপাদন খরচ আরো বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত রপ্তানি পণ্যের দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অন্যদিকে, এই অতিরিক্ত ব্যয় আমদানিকৃত পণ্যের দামের ওপরও সরাসরি পড়বে। সামনে পবিত্র রমজান মাস।

সংকট দ্রুত নিরসন না হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হবে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, শিপমেন্ট বিলম্বের কারণে ব্যাংক ঋণ ও এলসি ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সময়মতো দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে আর্থিক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আসন্ন রমজান ও ঈদের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই মুহূর্তেই সংকটের সুরাহা প্রয়োজন। এনসিটি ইজারা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকার চাইলে পুনরায় পর্যালোচনা করতে পারে। কিন্তু সে অজুহাতে বন্দর অচল রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একই সঙ্গে বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে তারা বলেন, আপনারাই এই বন্দরের প্রাণ। দাবি-দাওয়া জানানোর অধিকার আপনাদের আছে, কিন্তু জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকে নিজেই ঝুঁকির মুখে ফেলা। দেশের অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই অবস্থান থেকে সরে আসুন। বন্দর সচল করাই হবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।

বিবৃতির শেষে নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার ও আন্দোলনরত পক্ষগুলো আজই আলোচনার টেবিলে বসে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাবে। অন্যথায় এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণ কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।

টিজে/টিকে 

Share this news on:

সর্বশেষ

img
এপস্টেইনকে নিয়ে মুখ খুললেন অনুরাগ কাশ্যপ! Feb 05, 2026
img
আশা করা যায় এই জাতি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবে না: তাহের Feb 05, 2026
img

শেখ মনিরুল আলম টিপু

সত্যি কথা চোখে পানি রাখতে পারছিলাম না Feb 05, 2026
img
ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ হওয়াই আমার স্বপ্ন: মঈন আলী Feb 05, 2026
img
রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ নিয়ে ট্রাম্পের দাবির প্রতিক্রিয়া জানাল ভারত Feb 05, 2026
img
গ্যাব্রির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করল বায়ার্ন মিউনিখ Feb 05, 2026
img
আইনি বিপাকে মনোজ বাজপেয়ী! Feb 05, 2026
img
প্রতিরক্ষা খাতে চুক্তি স্বাক্ষর সৌদি আরব ও তুরস্কের Feb 05, 2026
img
অভিনেতা গোবিন্দর বাড়িতে দুষ্কৃতী ও লাগাতার হুমকি! Feb 05, 2026
img
বিএনপির আরও ৮ নেতাকে বহিষ্কার Feb 05, 2026
img
১৯ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে শামা ওবায়েদের ইশতেহার ঘোষণা Feb 05, 2026
img
বিএনপিকে আগামী ১২ তারিখ লাল কার্ড দেখাবো : রাশেদ প্রধান Feb 05, 2026
img
গাজা মিশনে অংশগ্রহণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা Feb 05, 2026
img
এমপিওভুক্ত হচ্ছে ১৭১৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান Feb 05, 2026
img
টিআরপি তালিকায় যুগ্ম শীর্ষে পরশুরাম ও পরিণীতা Feb 05, 2026
img
আইসিসি পাকিস্তানকে রাজি করাতে দায়িত্ব দিয়েছেন ইমরান খাজাকে Feb 05, 2026
img
সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের দুর্নীতি থাকবে না : প্রধান উপদেষ্টা Feb 05, 2026
img
সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক: গোলাম পরওয়ার Feb 05, 2026
img
আগামীর বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ সমান সুযোগ পাবে : আমীর খসরু Feb 05, 2026
img
একাত্তরে মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠনকারীরা বর্তমানে প্রতাপ দেখাচ্ছে: আমান Feb 05, 2026