দুর্ঘটনায় এক হাত হারিয়েও আজ তিনি বিশ্বের দ্রুততম ড্রামারদের একজন
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৩৫ পিএম | ০৭ মার্চ, ২০২৬
এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ তার জীবনকে এক মুহূর্তে বদলে দেয়। এক সময় যে দুই হাতে ড্রাম বাজিয়ে মঞ্চ কাঁপাতেন, সেই মানুষটিকেই পরে একটি হাত হারিয়ে নতুন করে শুরু করতে হয় জীবন। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। কৃত্রিম হাত, প্রযুক্তির সহায়তা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আজ বিশ্বের দ্রুততম ড্রামারদের একজন। আর তিনি হলেন মার্কিন ড্রামার জেসন বার্নস তার গল্প শুধু সাফল্যের নয়, বরং হার না মানার।
এক সময় জেসন বার্নস ছিলেন একজন স্বাভাবিক ড্রামার, যিনি মঞ্চে বাজিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। কিন্তু ২০১২ সালে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনি একটি হাত হারান। বহু স্বপ্নে আঘাত লাগলেও জেসন থামেননি। নিজের পছন্দের কাজে ফিরে আসার জন্য তিনি নিজেই তৈরি করেন কৃত্রিম হাত। এরপর আটলান্টার সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ড্রামিং প্রোগ্রামে ভর্তি হন এবং আরও উন্নত কৃত্রিম হাত তৈরির জন্য যুক্ত হন জর্জিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের এক বিকেলে জেসন বার্নস আটলান্টার একটি রেস্তোরাঁর ছাদে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের ধোঁয়া বের হওয়ার নালী পরিষ্কার করছিলেন। হঠাৎ কাছেই একটি বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে তিনি মাটিতে পড়ে যান, শরীর জুড়ে মারাত্মক দগ্ধ হন।
জেসন বার্নসের ডান হাত মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। চার সপ্তাহের চিকিৎসার পর ডাক্তার তাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করান দীর্ঘদিন ধরে হাত বাঁচানোর চেষ্টা করবেন, নাকি হাত কেটে ফেলার মাধ্যমে দ্রুত হাসপাতালে থাকা শেষ করবেন। তিনি হাত কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তটি সঠিক হলেও মানসিকভাবে তা ছিল ভীষণ কষ্টকর। চাকরি হারিয়েছেন, মায়ের বাসায় ফিরে যেতে হয়েছে।বারবার ভেবেছেন, হয়তো আর কখনো গিটার, পিয়ানো বা ড্রাম বাজানো সম্ভব হবে না।
দুর্ঘটনার আগে সংগীত ছিল জেসন বার্নসের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তার বাবা একজন জনপ্রিয় গিটারিস্ট ছিলেন, আর ছোটবেলা থেকেই বাবাকে বাজাতে দেখেই তিনি বড় হয়েছেন। ২২ বছর বয়সে তিনি দুটি ব্যান্ডে বাজাতেন। তবে হাত কেটে ফেলার পর তার স্বপ্ন যেন ভেঙে যায়। প্রায় এক মাস এই রুটিন চলার পর তিনি বুঝতে পারেন, এভাবে আর চলতে পারে না। মায়ের চিলেকোঠায় রাখা ড্রামগুলো নামিয়ে বারান্দায় বসান। নিজের কাটা হাতের অংশে একটি ড্রাম স্টিক টেপ দিয়ে বাঁধেন। বাজানো প্রচণ্ড ব্যথাজনক ছিল, তবু তাল রাখতে পারছিলেন। দুর্ঘটনার পর সেই প্রথমবার মনে হলো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।

এরপর তিনি নিজস্ব কৃত্রিম হাত তৈরি শুরু করেন। প্রথমটি ছিল খুবই সাধারণ প্লাস্টিক দিয়ে বানানো কাঠামো, যা ড্রাম স্টিক ধরতে পারে। রাবার ব্যান্ড দিয়ে সাধারণ কৃত্রিম হাতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে স্প্রিং এবং বিয়ারিং ব্যবহার করে উন্নত একটি সংস্করণ তৈরি করেন। সেই কৃত্রিম হাত ব্যবহার করে আবার তাঁর রেগে ব্যান্ডে বাজানো শুরু করেন।
দুর্ঘটনার প্রায় এক বছর পর তিনি একটি মিউজিক অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন জেসন বার্নস। সেখানে এক শিক্ষক তাকে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপকের সঙ্গে পরিচয় করান। তারা মিলে আরও উন্নত কৃত্রিম হাত তৈরির কাজ শুরু করেন। নতুন কৃত্রিম হাতটি সেন্সর ও মোটরের সাহায্যে কাজ করে। এতে ছয়টি ইলেকট্রোড রয়েছে, যা তাঁর অবশিষ্ট পেশির বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে। যখন তিনি হাত নড়ানোর কথা ভাবেন, পেশিগুলো সংকুচিত হয় এবং কৃত্রিম হাতটি সেই অনুযায়ী নড়াচড়া করে।
দুর্ঘটনার ১৪ বছর পর এই প্রযুক্তি তার জীবনে এমন সব দরজা খুলেছে যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। এখন তিনি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০ বার ড্রামে আঘাত করতে পারেন। ২০১৯ সালে তিনি সর্বাধিক ড্রাম হিটের বিশ্বরেকর্ডও গড়েছেন।
তবে রেকর্ডই তার প্রধান লক্ষ্য ছিল না। এখন তার মূল লক্ষ্য এই প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য করা, যাতে অন্যান্য প্রতিবন্ধী সংগীতশিল্পীরাও উপকৃত হতে পারেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি একটি অলাভজনক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা প্রতিবন্ধী সংগীতশিল্পীদের জন্য কৃত্রিম হাত তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এমকে/টিএ