খামেনির আস্থাভাজন কে এই আলী লারিজানি?
ছবি: সংগৃহীত
০৬:০২ পিএম | ১৭ মার্চ, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি আগের তুলনায় আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ মঙ্গলবার দাবি করেন, লারিজানি নিহত হয়েছেন, যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনো তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির তুলনায় লারিজানি অনেক বেশি দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করছিলেন। মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, লারিজানিকে গত সপ্তাহে তেহরানে সরকারপন্থী এক সমাবেশে জনতার সঙ্গে হাঁটতে দেখা যায়, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে তা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য বড় ধাক্কা হবে এবং এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হারানো হবে, যিনি আদর্শিক অবস্থান ও কূটনৈতিক দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম ছিলেন।
বাস্তববাদী
আদর্শিক আনুগত্য ও বাস্তবধর্মী রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে দক্ষ লারিজানি যুদ্ধের আগে ইরানের পারমাণবিক নীতি ও কৌশলগত কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
চশমা পরিহিত এবং সংযত বক্তব্যের জন্য পরিচিত ৬৮ বছর বয়সী লারিজানি দীর্ঘ সামরিক, গণমাধ্যম ও আইনসভা জীবনের কারণে প্রয়াত খামেনির আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত হতেন।
২০২৫ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের যুদ্ধের পর তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়—যে পদে তিনি প্রায় দুই দশক আগে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই পদে তিনি প্রতিরক্ষা কৌশল সমন্বয় ও পারমাণবিক নীতি তদারকি করতেন।
পরবর্তীতে তিনি কূটনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তেহরান যখন সতর্কভাবে পারমাণবিক আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন ওমান ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো সফর করেন—যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে ভেস্তে যায়।
‘কৌশলী পরিচালনাকারী’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ যুদ্ধ শুরুর আগে বলেন, ‘লারিজানি একজন প্রকৃত অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিত্ব, কৌশলী পরিচালনাকারী, এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী সম্পর্কে সুপরিচিত।
১৯৫৭ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি এমন এক প্রভাবশালী শিয়া আলেম পরিবারের সদস্য, যাদের ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। তার বাবা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
তার পরিবারের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তারা তা অস্বীকার করেছেন।
তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ্চাত্য দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি ১৯৯৪ থেকে এক দশক রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির প্রধান ছিলেন এবং পরে ২০০৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালে তাকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তিনি এই কাউন্সিলের সচিব ও প্রধান পারমাণবিক আলোচক হন এবং ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা পরিচালনা করেন।
তিনি ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলেও জনপ্রিয় প্রার্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কাছে পরাজিত হন এবং পরবর্তীতে পারমাণবিক কূটনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।
২০২১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে তার পুনরাগমন তার এমন একটি ভাবমূর্তির প্রতিফলন, যেখানে তিনি আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখেও বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করতে সক্ষম একজন রক্ষণশীল নেতা।
লারিজানি ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিকে সমর্থন করেছিলেন, যা তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে দাঁড়ানোর ফলে ভেঙে পড়ে।
২০২৫ সালের মার্চে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক চাপ ইরানের পারমাণবিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।
তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে এগোচ্ছি না, কিন্তু ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে আপনারা ভুল কিছু করলে, তা আমাদের সেই দিকে যেতে বাধ্য করবে, কারণ আত্মরক্ষার জন্য তা প্রয়োজন হয়ে উঠবে।’
লারিজানি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুধু পারমাণবিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তিনি ইরানের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কঠোর দমন-পীড়ন
যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারি মাসে দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে ‘সহিংস দমন-পীড়ন’-এর অভিযোগে যেসব কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, লারিজানি তাদের মধ্যে ছিলেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভে সরকারি কঠোর দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত হয় বলে অধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
লারিজানি স্বীকার করেছিলেন যে অর্থনৈতিক চাপ ‘বিক্ষোভের কারণ’ ছিল, তবে পরবর্তী সহিংসতার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘বহিরাগত সম্পৃক্ততা’কে দায়ী করেন।
এসএন