© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

পুত্রকে দেয়া শেষ চিঠিতে কী লিখেছিলেন রাহুল?

শেয়ার করুন:
পুত্রকে দেয়া শেষ চিঠিতে কী লিখেছিলেন রাহুল?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:৪০ পিএম | ৩০ মার্চ, ২০২৬
কলকাতার বাংলা সিনেমায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই। তার আকস্মিক মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো টালিউড। জানা গেছে, রোববার পশ্চিমবঙ্গের তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়েছিলেন ৪৩ বছর বয়সী এই অভিনেতা। শুটিংয়ের একপর্যায়ে সমুদ্রে নামেন তিনি।
পরে হঠাৎ তলিয়ে গেলে সেটে থাকা টেকনিশিয়ানরা তাকে উদ্ধার করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে রাহুলের একটি চিঠি। সেটি তিনি লিখেছিলেন তার পুত্র সহজকে। ব্যক্তিজীবনে ২০১০ সালে অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারকে বিয়ে করেন রাহুল। তবে ২০১৭ সাল থেকে আলাদাভাবে বসবাস শুরু করেন এই দম্পতি, পরবর্তীতে তাদের বিচ্ছেদ হয়। তাদের একমাত্র সন্তান সহজ।



সহজকে লেখা শেষ চিঠিতে রাহুল লিখেছেন, ‌‘এই চিঠিটা আজকে ‘ফাদারস ডে’ বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ‘ফাদারস ডে’, ‘মাদারস ডে’- এগুলো আলাদা করে জানতো না। কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এসব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।

জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু যখন তোমার মায়ের ১৪ বছর বয়স ছিল, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যে হেতু ছোট, তাই অন্যদের ছেড়ে শেষে আমাদের শট নেওয়া হতো। আর আমরা দু’জন সেটের কোনায় বসে আড্ডা মেরে যেতাম। তোমার মা ছিল বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে আর আমি খুব সাধারণ এক সরকারি চাকুরের ছেলে। আমরা দু’জন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে। তোমাকে এই গল্প কেন বলছি জানো? যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে, ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা।

এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি, কী বলো?

যে দিন আমরা প্রথম খবর পাই, তুমি আমাদের জীবনে আসছো, আমরা আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম জানো? তোমার মা গুচ্ছের সব অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলল। রোজ আমাকে আপডেট দিত, ‘এখন ওর সাইজ আপেলের মতো’, ‘এখন ওর সাইজ আনারসের মতো’, আরও কত কী! তারপর যখন তুমি হলে, তোমার মায়ের আর একটা রূপ দেখলাম। তুমি জানো না হয়তো, তোমার মা তোমাকে কোনও দিন বাজার চলতি বেবিফুড কিনে খাওয়ায়নি। সব নিজের হাতে বানাত। তাতে যদি সারা দিন লাগে, তো লাগুক। তোমার মায়ের তোমার জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত। আজ তোমার মা ইনস্টাগ্রামে যথেষ্ট এস্থেটিক ছবি দেওয়ার পরেও উড়ো কমেন্ট ভেসে আসে ‘লজ্জা করে না আপনার? আপনি কিনা মা?’ না, এ নিয়ে কোনও দুঃখবোধ আছে ভেবো না, গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গিয়েছি। শুধু তোমাকে বলছি, তোমার মায়ের লড়াইয়ের একটা আন্দাজ দেওয়ার জন্য। আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মাও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর শুশ্রূষা করবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে? আমি তোর বাপ (হাঃ হাঃ), দূর সম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়ই। আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক'টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো এরপর থেকে। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম। সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার.....’

প্রসঙ্গত, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা-দুই মাধ্যমেই নিজের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান এই অভিনেতা।

বড়পর্দায় তার যাত্রা শুরু হয় ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমার মাধ্যমে। মুক্তির পরই ছবিটি বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পায় এবং তাকে নতুন সম্ভাবনাময় তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে বাণিজ্যিক ও মূলধারার নানা সিনেমায় সমানতালে অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন রাহুল।

তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জ্যাকপট’, ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’, ‘কাগজের বউ’ ও ‘আকাশ অংশত মেঘলা’। প্রতিটি কাজেই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

অভিনয়ের পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন রাহুল। সম্প্রতি ‘সহজকথা’ নামে একটি পডকাস্ট শুরু করেন তিনি, যা শ্রোতাদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল।

 
পিআর/এসএন  

মন্তব্য করুন