© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

মিয়ানমারের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট 'মিন অং হ্লাইং'

শেয়ার করুন:
মিয়ানমারের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট 'মিন অং হ্লাইং'

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০১:১৭ পিএম | ০৩ এপ্রিল, ২০২৬
মিয়ানমারে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাঁচ বছর পর এবার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং।

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর তার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

সংবাদ সংস্থাগুলোর চলমান ভোট গণনার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দেশের সামরিকপন্থী সংসদে প্রদত্ত ৫৮৪টি ভোটের মধ্যে মিন অং হ্লাইং কমপক্ষে ২৯৩টি ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করেছেন।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার মাত্র সাত দিন পর জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, দেশটি এক বছরের মধ্যে বেসামরিক শাসনে ফিরে যাবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তার সময় লেগেছে দীর্ঘ পাঁচ বছর। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পদে বসার জন্য ইতোমধ্যেই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

নতুন সরকার গঠিত হলেও তাতে সামরিক কর্মকর্তাদেরই প্রাধান্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে মিন অং হ্লাইং-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং কঠোরপন্থি ও নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন উ-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এ ছাড়া তিনি একটি নতুন পরামর্শদাতা পরিষদও গঠন করেছেন। এই পরিষদের কাছে বেসামরিক ও সামরিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে। এক কথায়, সামরিক পোশাক খুললেও ক্ষমতা যেন কমে না যায়, সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন তিনি।

মিন অং হ্লাইং- এর অভ্যুত্থানের পর গত পাঁচ বছর মিয়ানমারের জন্য ছিল বিপর্যয়কর। কিয়াও উইনের মতো তরুণ আন্দোলনকর্মীদের জন্য পরিবর্তনের আশা শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রাবস্থায় ২০২২ সালের অভ্যুত্থানবিরোধী এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জেলে পাঠানোর আগে এক সপ্তাহ ধরে নির্যাতন করা হয়। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া এই তরুণ জানান, লোহার রড দিয়ে তার পিঠে আঘাত করা হয়েছে, সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে, ছুরি দিয়ে উরুতে আঘাত করা হয়েছে এবং যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। তবে তার ওপর নির্যাতন চললেও, তারা কখনোই স্পষ্ট জানায়নি যে কী শুনতে চায়। কিয়াও উইনের বিপ্লবের প্রতি অঙ্গীকার অপরিবর্তিত থাকলেও এখন মিয়ানমারের ভেতর থেকে কাজ করা সীমিত হয়ে পড়ায় তিনি দেশের বাইরে কাজ খোঁজার কথা ভাবছেন।

২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে অং সান সু চি এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংসদ যখন তাদের আরও এক মেয়াদের অনুমোদন দিতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষমতা দখল জনরোষ উসকে দেয়। মিন অং হ্লাইং তা সামলাতে ব্যর্থ হন এবং গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করেন। এটি গৃহযুদ্ধের সূচনা করে, যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং দেশটির অর্থনীতি ধ্বংস করেছে।

সামরিক শাসন দেশের বিশাল এলাকা সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর জবাবে তারা বিরোধী পক্ষের নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলোতে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়েছে, যা স্কুল, বাড়ি এবং হাসপাতাল ধ্বংস করেছে। মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল "চার আঘাত" (ফোর কাট)-এর লক্ষ্যই হলো বিদ্রোহী গোষ্ঠী সমর্থনকারী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা। তবে চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক বাহিনী গত দুই বছরে হারানো কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।

মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হলেও অভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কোনো আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার ইঙ্গিত সেখানে ছিল না। বরং পুরোনো সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তিই উচ্চারিত হয়। মিন অং হ্লাইং দাবি করেন, জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সাংবিধানিক ম্যান্ডেট সেনাবাহিনীর রয়েছে। সামরিক শাসনের বিরোধীদের "সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী" হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি জানান, তাদের পেছনে "বিদেশি আগ্রাসী ও স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা" রয়েছে।

সশস্ত্র সংঘাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা এসিএলইডি'র জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সু মন বলেন, মিয়ানমারের সংঘাত অপরিবর্তিতই থাকবে। নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন উ একজন অনুগত ব্যক্তি, যার পরিবার মিন অং হ্লাইং-এর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এখনও প্রায় ৯০টি শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এর মানে হলো প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আরও বিমান ও ড্রোন হামলা এবং আরও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চলবে।

এদিকে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে পরিচালিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে না এবং নতুন সরকার, সংসদ ও নির্বাচনের পুরোপুরি অবৈধতা ঘোষণা করেছে। রাজনীতি থেকে সেনাবাহিনী অপসারণ এবং নতুন ফেডারেল সংবিধান প্রণয়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। মুখপাত্র নে ফোন লাট বলেন, "এটি সমঝোতার সময় নয়। সেনাবাহিনী আমাদের লক্ষ্য মেনে না নিলে আমাদের বিপ্লব চলবে। থেমে গেলে আগামী প্রজন্মের মানুষ আরও ভোগান্তিতে পড়বে।"

অভ্যুত্থান হওয়া দেশটির অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের জরুরি সহায়তার প্রয়োজন। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধ্বংস করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট। মিয়ানমারের আমদানিকৃত ৯০ শতাংশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য প্রতিবেশী দেশ থেকে আসে। এখন রপ্তানি সীমিত হওয়ায় পেট্রোল ও ডিজেল রেশনিং করা হচ্ছে এবং দামও আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে জ্বালানি সংকট ব্যবসার জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের জন্য জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। ইয়াঙ্গুনে দিনের কয়েক ঘণ্টাই মাত্র বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। ইয়াঙ্গুনের শিল্প এলাকা লাইং থারইয়ারের মোটরবাইক ট্যাক্সিচালক টিন উ বলেন, "এখন দিন-রাতের মতো পার্থক্য। ভাড়া ও খাবারের খরচ মেটানোর মতো আয় করা যাচ্ছে না। নতুন সরকারের ওপর আস্থা নেই, তাই নিজস্বভাবে চলতে হচ্ছে।"

মিয়ানমারের বহু বছর কারাগারে কাটানো রাজনৈতিক কর্মী মিয়া আয় এ সপ্তাহে একটি বিরল কণ্ঠ নিয়ে সামনে এসেছেন। তার যুক্তি, সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সামরিক বাহিনী এবং বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা খোঁজা। তিনি একটি নতুন কাউন্সিল গঠন করেছেন এবং সংলাপ আহ্বান ও সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করে সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, "এই নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। মিন অং হ্লাইং জনগণের সঙ্গে খেলা খেলছেন। বর্তমান সংবিধান দিয়েও এগোতে পারব না। জনগণ ক্লান্ত, আর যদি কোনো পথ না খুঁজে পাই, দেশ ধসে পড়বে।"

তার মতে, কারাবন্দি অং সান সু চি মুক্তি পেলে, ৮০ বছর বয়সেও তিনি সমঝোতা খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। এ বছর যেকোনো সময় মিন অং হ্লাইং তাকে মুক্তি দিতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন। তবে মিয়ানমারে শান্তির পথ থাকলেও তা অত্যন্ত সংকীর্ণ, এবং সামরিক শাসকরা আপাতত সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়।

সূত্র: আল জাজিরা ও বিবিসি বাংলা

এসকে/এসএন

মন্তব্য করুন