হরমুজ প্রণালি পারাপারে ইরানের নতুন পরিকল্পনা
ছবি: সংগৃহীত
০৮:৩৪ পিএম | ০৪ এপ্রিল, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমামন উত্তেজনার মধ্যে এবার গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত ব্যাপক নীতিমালা তৈরি করেছে ইরান। এসব নীতিমালা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব ফেলেছে, তেমনি ইরান যুদ্ধের ক্ষতি পূরণেও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি ব্যবহারে সম্পর্কের ওপর নির্ভর বিশ্বের দেশগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে তেহরান।
শনিার সংবাদমাধ্যম তাস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পরিকল্পনার আওতায় বিশ্বের দেশগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে।
এসব শ্রেণি হলো- ‘শত্রু’, ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’।
প্রথম শ্রেণির দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে ব্যবহার করতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। ‘নিরপেক্ষ’ দেশগুলোর জাহাজকে উচ্চ ফি দিতে হবে। আর ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি পারাপারের স্বাধীন অধিকার দেওয়া হবে।
তেহরান এখনো এই তিনটি শ্রেণির পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেনি।
এর আগে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের প্রায় সব আরব দেশগুলোকে ‘নিরপেক্ষ’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই দেশগুলোকে ‘উচ্চ ফি’ দিতে হবে অথবা পুরোপুরি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
শিপিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরাসরি আলোচনায় যুক্ত সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আইআরজিসি ইতোমধ্যে প্রণালি পার হওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায় করছে এবং যেসব দেশকে বন্ধুত্বপূর্ণ মনে করে তাদের জাহাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, আর যেসব দেশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে তাদের জাহাজে হামলার হুমকি দিচ্ছে।
ফার্স বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি হরমুজ প্রণালিতে ফি আরোপের একটি বিল অনুমোদন করেছে।
এদিকে, পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক আরো একটি ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে।
জাহাজ পরিচালনাকারীদের আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাহাজের মালিকানা, পতাকা, পণ্যের বিবরণ, গন্তব্য, নাবিকদের তালিকা এবং স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস)-এর তথ্য জমা দিতে হচ্ছে।
মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটি এসব তথ্য আইআরজিসি নৌবাহিনীর হরমোজগান প্রাদেশিক কমান্ডে পাঠায়, যাতে যাচাই করা যায় জাহাজটির সঙ্গে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের দৃষ্টিতে শত্রু রাষ্ট্রগুলোর কোনো সম্পর্ক আছে কি না। কোনো জাহাজ অনুমোদন পেলে তারপর টোল নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরান বিভিন্ন দেশের জন্য এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত একটি র্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোর জাহাজগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো শর্ত পেয়ে থাকে।
তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে দরকষাকষির প্রাথমিক মূল্য সাধারণত প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য প্রায় ১ ডলার, যা ইউয়ান বা স্টেবলকয়েন—অর্থাৎ স্থিতিশীল মুদ্রার সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পরিশোধ করা হয়। একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) সাধারণত প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করতে পারে।
টোল পরিশোধের পর আইআরজিসি একটি অনুমোদন কোড এবং নির্ধারিত রুট নির্দেশনা দেয়। জাহাজগুলোকে সেই দেশের পতাকা তুলতে হয়, যে দেশ পারাপারের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনও ওই দেশে পরিবর্তন করতে হয়।
হরমুজ প্রণালির কাছে পৌঁছালে জাহাজটি তার ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (ভিএইচএফ) রেডিওর মাধ্যমে পাসকোড সম্প্রচার করে। এরপর একটি টহল নৌযান এসে সেটিকে প্রণালি পার করে নিয়ে যায়। এই পথটি দ্বীপঘেরা উপকূল ঘেঁষে, যা ইতোমধ্যে শিপিং খাতে 'ইরানি টোলবুথ' নামে পরিচিতি পেয়েছে।
জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছে, যদিও তা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় এখনও অনেক কম।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে ইরানও। দেশটি ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই বিশ্ব জালানি পরিহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
টিকে/