প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম প্রায় ৫০ টাকা বৃদ্ধির আভাস
ছবি: সংগৃহীত
০৬:৩৯ পিএম | ০৫ এপ্রিল, ২০২৬
জেট ফুয়েল এবং এলপিজির পর ফার্নেস অয়েলের দাম বড় লাফ দিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতি লিটার ৭০.১০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার মতো হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
প্রধানত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে এই তেল ব্যবহৃত হয়। বর্তমান দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১৯ টাকার মতো। দাম বৃদ্ধির হলে ২৭ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
ইরান যুদ্ধের কারণে সব ধরণের জ্বালানির দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। যার কারণে জেট ফুয়েল লিটারে ৯০ টাকা এবং ১২ কেজি এলপিজিতে ৩৮৭ টাকা দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। যদিও রোববার (৫ এপ্রিল) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দর নির্ধারণের বৈঠকটি সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আজকে ফার্নেস অয়েলের একটা হিসাব নিয়ে বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করতে হবে।পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত দুই ধরণের ফার্নেস অয়েল আমদানি হয়। আমরা যখন গণশুনানি করি তখন দুইটার অনুপাত বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু মার্চে অপরিশোধিত ফার্নেস অয়েল আমদানি করা হয়নি। যে কারণে হিসাবটা নতুন করে ক্যালকুলেট করার বিষয় রয়েছে। আবার বসতে হবে বিষয়টি নিয়ে।
বিইআরসি সুত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যখন ফার্নেস অয়েলের দাম (বিইআরসি প্রথমবার) ঘোষণা করে, প্রিমিয়ামসহ প্লাটস দর ছিল ৩৯৬.৯৬ ডলার। আর মার্চে ৯৬ শতাংশ বেড়ে প্লাটস মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৪২.৭৪ ডলারে। এতে করে প্রতি লিটারে আমদানি খরচ পড়ছে ৮৪.২৪ টাকা। এরসঙ্গে বিইআরসির ট্যারিফ কাঠামোর অনুযায়ী আমদানি শুল্ক, বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানির কমিশনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে দাম দাঁড়ায় ১২১ টাকার মতো।
বিপিডিবি’র একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সরকারতো ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ায়নি। তাহলে ফার্নেস অয়েলের দাম কেনো বাড়াবে বিইআরসি। পেট্রোল-অকটেন ব্যবহার করে তুলনামুলক ধনিক শ্রেণির লোকজন। আর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হতদরিদ্র থেকে সবশ্রেণির লোকজন। এখনই বিদ্যুৎ খাত বিশাল ঘাটতি রয়েছে, দাম বেড়ে গেলে ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। অন্যদিকে বিপিসি ও তাদের বিতরণ কোম্পানিগুলো এতোদিন বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছে। কিছুদিন লোকসান দিলেও তাদের লাভ থাকবে। এছাড়া বিইআরসি যে দর কাঠামো ঘোষণা দিয়েছে, সেখানে আমাদের অনেক আপত্তি রয়েছে। ৮৪ টাকার তেলের সঙ্গে নানা রকম কমিশন যোগ করা হচ্ছে ৩৫ টাকার মতো। এটা স্বচ্ছ ক্যালকুলেশন বলা যায় না।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা বলেছি আগের আমদানি করা তেলের দাম না বাড়াতে। বাড়তি দামের তেল দেশে আসার পর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে দাম বাড়ালে অর্থবিভাগ থেকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। ভর্তুকি না পেলে তেল কিনতে পারবো না। এতে করে সমস্যা হতে পারে!
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, গতকালেই ফার্নেস অয়েল থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়েছে। আদানির একটি ইউনিট বসে গেছে বয়লারে লিকেজের কারণে। আগামী ১১ তারিখের আগে আসবে না বলে জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে গড় উৎপাদন খরচ পড়ছে ১১.৮৩ টাকা, আর বিক্রি করা হয়েছে ৬.৯৯ টাকায় (পাইকারি)।ওই অর্থবছরে ১ লাখ ১ হাজার ১৮৭ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। প্রতি ইউনিটে ৫.৯৯ টাকা হারে ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা।
ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়ে গেলে এই খরচ আরও বেড়ে যাবে। পাশাপাশি গ্যাস সংকট পরিস্থিতিতে আরও জটিল করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস দিয়ে ৪৪.০৯ শতাংশ, কয়লায় ২৬.৭২ শতাংশ, ফার্নেস অয়েলে ১০.৭৩ শতাংশ যোগান এসেছে। গ্যাস দিয়ে উৎপাদনে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়েছে ৭.০৯ টাকা, কয়লায় ১৩.২০ টাকা, ফার্নেস অয়েলে প্রায় ১৯ টাকা, আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে ১৪.৮৬ টাকা, ভারত সরকারের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম পড়েছে ৮.৭১ টাকা এবং সৌর বিদ্যুতের দাম পড়েছে ১৫.৪৬ টাকা। সে কারণে ফার্নেস অয়েলের উৎপাদন বৃদ্ধি মানেই লোকসান বাড়ানো।
এমআই/এসএন