জয়াকে নিয়ে আক্ষেপ জানালেন চূর্ণী
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৩৬ পিএম | ০৯ এপ্রিল, ২০২৬
‘অভিমান’ ছবির মাধ্যমেই জয়া ভাদুড়ীকে চেনার শুরু অভিনেত্রী চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের। এর পর অনেক ছবি দেখেছেন অভিনেত্রী জয়ার, তাঁকে আবিষ্কার করেছেন একটু একটু করে। জয়ার সঙ্গে চূর্ণীর প্রথম চাক্ষুষ পরিচয় লখনউয়ে, সিনেমা সংক্রান্ত একটি বৈঠকে। তার পর মাঝের কয়েকটা বছর আর কোনও দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। এর পর সোজা ‘রকি অউর রানি কি প্রেমকহানি’-র সেটে আলাপ। জয়ার জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে কাজের সেই অভিজ্ঞতার কথা চূর্ণী ভাগ করে নিলেন আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে।
কথার শুরুতেই জয়ার অভিনয়ের প্রসঙ্গে ঢুকে পড়লেন চূর্ণী। বললেন, “অল্প অভিব্যক্তি বদল করে একটা চরিত্রের মনন বোঝানোর ক্ষমতা আমার কাছে ছিল শিক্ষণীয়।” একসঙ্গে ওঁরা কাজ করেছেন ‘রকি অউর রানি কি প্রেমকহানি’ ছবিতে। সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে চূর্ণী বলেন, “ওঁর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। ধর্মেন্দ্রজিও ছিলেন সেই সেটে। নতুন একটা সেটে যখন আমাকে ও টোটাকে (রায়চৌধুরী) সকলের সঙ্গে আলাপ করাচ্ছেন, সেই ধরনটা আমাকে বেশ অবাক করেছিল। উনি আমাদের সম্বন্ধে বাকিদের বলেন, ‘ওঁরা বাংলা ইন্ডাস্ট্রির খুব জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী। তোমরা হয়তো ওঁদের কাজ দেখোনি। কিন্তু ওঁরা খুব প্রতিভাবান।’ তখন মনে হয়েছিল যেন কতদিনের আলাপ আমাদের, আমাদের কাজ দেখেছেন। সে দিন ওঁর আন্তরিকতা, উষ্ণ আচরণ আমায় ছুঁয়ে গিয়েছিল। যদিও ছবিতে আমার সঙ্গে খুব কম দৃশ্যই ছিল।”
আবার অভিনয় প্রসঙ্গে ফেরেন চূর্ণী। বলেন, “আসলে জয়া বচ্চন খুব পলিশ্ড এক জন মহিলা। সেখান ‘রকি অউর রানি কি প্রেমকহানি’-তে যে চরিত্রটা করেছেন সেটা খানিকটা অন্য রকম। কথা বলার ধরন পুরোপুরি বদলে ফেলতে হয়েছে। তা নিয়ে কোনও আক্ষেপ নয়, তবে মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘কর্ণ ভীষণ ওভারঅ্যাকটিং করতে বলে, আমি যে কী করে এই অতি অভিনয় করব জানি না।’”

অল্প বয়স থেকেই জয়া ভাদুড়ি বাংলার বাইরে। তবু নিজের ভাষার আবেগ তো থাকেই! চূর্ণী বললেন, “একটু সুযোগ পেলেই বাংলা বলে নিতেন। আমাকে বা টোটাকে কিছু বলার থাকলেই একেবারে ঝরঝরে বাংলায় বলতেন। প্রায়ই কলকাতার খবর জানতে চাইতেন। বাঙালি দেখলেই বাংলায় কথা বলার যে এই ইচ্ছে, তা দেখলেই বোঝা যায়, যতই তিনি বচ্চনবধূ হন না কেন, বাংলার শিকড় উনি ছাড়েননি।”
এক জন সহ-অভিনেতা হিসেবে জয়ার কোনও তুলনা চলে না। এই বয়সেও শুটে সব দিকে তাঁর খেয়াল। সেই প্রসঙ্গেই চূর্ণী বললেন, “আসলে তাঁর সব দিকে সকলের প্রতি খেয়াল। ‘রকি অউর রানি কি প্রেমকহানি’-এর শেষ দিনের শুটিং। সে দিন বড্ড গরম ছিল। বেশ কষ্টেই শুটিং করতে হচ্ছিল। শটের ফাঁকে ফাঁকে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম সবার জন্য শরবত এবং শিঙাড়া আনালেন। সবাইকে বললেন খেয়ে নিতে। আমরা একসঙ্গে গ্রিনরুমে বসে হইহই করে খাওয়াদাওয়া সারলাম।” এর পরেই চূর্ণীর বক্তব্য, “আসলে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন কেউ কাজ করতে গেলে একটু বাইরের লোকের মতো ব্যবহার পাওয়ার বিষয় থাকে। কিন্তু উনি সেটা বিন্দুমাত্র বুঝতে দেননি, মানুষটা এমনই।”
শুটিংয়ের সেটে জয়ার জন্য উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন চূর্ণী। বললেন, “জানতাম ওঁর সঙ্গে দেখা হবে, তাই কলকাতা থেকে একটা কাঁথা স্টিচের কাঁথা নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটা দেখে নাকি অমিতাভ বচ্চন বলেছিলেন, তাঁর জন্য একটা নিয়ে যাইনি কেন? বলেছিলেন, ‘শুধু জয়াকে দিলেন। এত সুন্দর দেখতে একটা কাঁথা’! শুনে আমি মজা করে জয়া বচ্চনকে বলেছিলাম, ‘আমি তো আপনাকেই বেশি ভালবাসি।’ তা শুনে সেই গালভরা হাসি ওঁর।”
এর পরেই চূর্ণী বলেন, “যদিও ওঁর ব্যক্তিত্বের অন্য একটা দিক আছে। যার ফলে অনেকেই ভয় পান। কিন্তু আমি একেবারেই সেটা অনুভব করিনি। এত মিষ্টি স্বভাবের মানুষ যে ওঁর কড়া দিকটা খুঁজে পাইনি। হয়তো কোনও খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তার জন্য আত্মরক্ষার দিকটা ভেবে বাইরে একটা ঢাল তৈরি করে রাখেন।” তাঁর কথায়, “জয়া বচ্চন মানেই যে ভয় লাগবে, গম্ভীর হয়ে বসে থাকবেন তেমন মানুষও নন। সেটে দেখেছি সকলের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। গল্প করছেন কখনও, আবার কখনও ছোটদের সঙ্গে রসিকতা করছেন।”
জয়াকে নিয়ে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে চূর্ণীর। সেটা খোলসা করে বললেন, “আমি ভাবি, ‘অভিমান’ ছবির গল্পই কি জয়া বচ্চনের জীবন? না কি নিজেকে স্বেচ্ছায় গুটিয়ে নিয়েছিলেন? সত্যিই কি কাজের প্রস্তাব আসেনি ওঁর কাছে? এর উত্তর অজানা। আমার খালি মনে হয়, এত প্রতিভাবান একজন শিল্পী, কোথাও যেন হারিয়ে গেলেন। সেই ভাবে তাঁকে ব্যবহার করা হয়নি ইন্ডাস্ট্রিতে। ওঁর থেকে তো আরও কত চরিত্র উপহার পেতে পারতাম।” এর পরেই নিজের সুপ্ত ইচ্ছেটা জানিয়ে বললেন, “আমি যদি ওঁকে নিয়ে কিছু ভাবতে পারি নিশ্চয়ই চাইব ফের ওঁর সঙ্গে কাজ করতে। সে রকম কিছু হলে দারুণ অভিজ্ঞতা হবে!”
চূর্ণীর বক্তব্য, জয়া বচ্চনের ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং একজন শিল্পীকে তাঁর শিল্প দিয়েই বিচার করা ভাল। জীবনে চলার পথে প্রত্যেকের আলাদা লড়াই থাকে, তা একমাত্র তিনিই জানেন। বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। চূর্ণী তাই বলেন, “আমরা ওঁকে জয়া বচ্চন বানিয়ে ফেলেছিলাম, জয়া ভাদুড়ি হিসেবে আর দেখিনি। ওঁর সব পরিচয়ই বচ্চন পরিবারকে ঘিরে হয়ে গিয়েছে।”
আক্ষেপের সুর চূর্ণীর কণ্ঠে, “ আমাদের সমাজই যেন ওঁর নিজস্বতা কোথাও হারিয়ে ফেলেছে। তার জন্য হয়তো দায়ী করছেন এই সমাজকেই। আমরাই করেছি এটা। সমাজের বিষয়টাই এরকম। এটা কিছুটা পুরুষতন্ত্রও বটে। এখন উনি অমিতাভ বচ্চনের স্ত্রী আর অভিষেকের মা।” শেষে তাঁর কথা, “তাঁর জন্মদিনে চাইব, সারাজীবন যাতে এমনই মনখোলা থাকেন, শান্তি এবং ভালবাসা তাঁকে ঘিরে থাকে। খুব ভাল থাকুন বাংলার ‘ধন্যি মেয়ে’।”
এসএ/টিকে