© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

দর্শক টানতে ব্যর্থ শাকিবের নতুন ছবি

শেয়ার করুন:
দর্শক টানতে ব্যর্থ শাকিবের নতুন ছবি

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:৩৭ পিএম | ০৯ এপ্রিল, ২০২৬

শাকিব খান মানেই বক্স অফিসে সাফল্য, এ ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ঢালিউড। তবে সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রিন্স’ যেন সেই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বড় বাজেট, তারকাখচিত উপস্থিতি আর আগাম প্রচারণা মিলিয়ে সিনেমাটি ঘিরে তৈরি হয়েছিল উচ্চ প্রত্যাশা। কিন্তু মুক্তির পর দর্শক প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ছবির উপযুক্ত মসলা যেমন- গল্প, চিত্রনাট্য ও উপস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে শুধু তারকা উপস্থিতি দিয়ে সিনেমাকে টিকিয়ে রাখা যায় না, এটাই যেন নতুন করে প্রমাণ করল ‘প্রিন্স’।

ফলে ঢালিউডে এখন প্রশ্ন উঠছে, সময় কি বদলে গেছে, নাকি দর্শকের রুচিই পাল্টে দিয়েছে সফলতার সংজ্ঞা? সেই উত্তর খুঁজতে হবে সিনেমাপাড়ার সবাইকে সম্মিলিতভাবে। সেইসঙ্গে শাকিব খানকেও সতর্ক হতে হবে ছবির গল্প, চরিত্র ও টিম বাছাইয়ে। নইলে এত সাধনায় গড়া সুনাম ও ক্যারিয়ারে যে দাগ লাগতেই থাকবে।

কেমন হলো ‘প্রিন্স’ সিনেমা, সেই ব্যবচ্ছেদ করার অনেক উপায় আছে। তবে একজন সিনেমাপ্রেমী দর্শক হিসেবে ছবিটি নিয়ে আলোচনাটা পরিচালক, প্রযোজক, টিম ও শাকিব খানের জন্য চিন্তার খোরাক হবে সেই প্রত্যাশা নিয়েই করতে চাই।
গত কয়েক বছরে শাকিব খানের কাজ ও পর্দা উপস্থিতিতে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তাতে অনেকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী গল্প, নির্মাণ ও উপস্থাপনায় নতুনত্ব আনার যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছিল, তাও দর্শকদের মাঝে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। স্বভাবতই ‘প্রিন্স’ সিনেমাটি মুক্তির আগেই দর্শকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়।

কিব খানের আগের সিনেমাগুলোর সাফল্য ছাড়িয়ে যাবে ‘প্রিন্স’, তেমনটাই ধারণা করা হচ্ছিলো। কিন্তু সিনেমাটি মুক্তির পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাকটা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথমেই বলতে হয়, ‘প্রিন্স’ সিনেমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর গল্প। গল্পে এমন কোনো নতুনত্ব নেই, যা দর্শককে চমকে দিতে পারে বা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে। বরং পুরো কাহিনিটা এমনভাবে এগিয়েছে, যেন আমরা আগেও এই গল্প বহুবার দেখেছি। নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধ-সবকিছুই যেন পরিচিত এক ছকে বাঁধা। ফলে সিনেমা দেখতে বসে দর্শকের মনে বারবারই একঘেয়েমি কাজ করে।

চিত্রনাট্যও সেই একই সমস্যায় ভুগেছে। দৃশ্যগুলোর মধ্যে সংযোগ অনেক জায়গায় দুর্বল। আর নাটকীয়তা তৈরি করার চেষ্টা থাকলেও তা প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আবেগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। বরং সেগুলো অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক বা অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে।

অভিনয়ের দিক থেকে দেখলে, শাকিব খান তার পরিচিত স্টাইলেই অভিনয় করেছেন। তবে এই সিনেমায় তার চরিত্রে গভীরতার অভাব রয়েছে। তিনি চেষ্টা করেছেন, কিন্তু চিত্রনাট্যের দুর্বলতা তার অভিনয়কে পুরোপুরি ফুটে উঠতে দেয়নি। অনেক জায়গায় তার এক্সপ্রেশন একঘেয়ে মনে হয়েছে, যা দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এই সিনেমায় রাশেদ মামুন অপু তার চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে।

এখানে একটি তুলনা অনিবার্য হয়ে পড়ে। এক সময়কার জনপ্রিয় নির্মাতা বদিউল আলম খোকন শাকিব খানকে যেভাবে সংলাপ, অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমে একটি চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন, সেই গভীরতা বর্তমান সময়ের অনেক অভিনয়ে অনুপস্থিত- ‘প্রিন্স’ তার একটি উদাহরণ। এখানে চরিত্রগুলো যেন পুরোপুরি প্রাণ পায়নি, বরং অনেকটাই যান্ত্রিক মনে হয়েছে।

সিনেমাটির সংলাপও তেমন শক্তিশালী নয়। বেশ কিছু সংলাপ শোনার পর মনে হয়, এগুলো আগেও অনেকবার শোনা হয়েছে। নতুন কোনো ভাবনা বা তীক্ষ্ণতা এখানে অনুপস্থিত। ফলে সংলাপগুলো দর্শকের মনে দাগ কাটতে পারেনি। তবে সিনেমাটির একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে এর ক্যামেরার কাজ। কিছু দৃশ্যে চিত্রগ্রহণ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। লোকেশন, ফ্রেমিং এবং লাইটিং-সব মিলিয়ে ভিজ্যুয়াল দিক থেকে সিনেমাটি কিছুটা এগিয়ে। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে ক্যামেরার ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ভালো দিকগুলো পুরো সিনেমার দুর্বলতাকে ঢাকতে পারেনি।

অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে আলাদা করে বলতে হয়। যদিও অ্যাকশন দৃশ্যের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু সেগুলোতেও নতুনত্বের অভাব রয়েছে। অনেক জায়গায় অ্যাকশন দৃশ্যগুলো অতিরঞ্জিত এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। দর্শককে উত্তেজিত করার বদলে সেগুলো অনেক সময় ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে।



এডিটিং এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। কিছু জায়গায় দৃশ্যের গতি ঠিকমতো ধরে রাখা হয়নি। আবার কিছু দৃশ্যে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘতা দেখা গেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অনেক সময় দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি, যা পুরো অভিজ্ঞতাকে কিছুটা ব্যাহত করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ‘প্রিন্স’ এমন একটি সিনেমা, যা বর্তমান দর্শকের চাহিদা বুঝতে পারেনি। এখনকার দর্শক শুধু নায়ককেন্দ্রিক গল্প নয়, বরং শক্তিশালী গল্প, বাস্তবসম্মত উপস্থাপন এবং নতুন কিছু দেখতে চায়। কিন্তু ‘প্রিন্স’ সেই জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘প্রিন্স’ একটি গড়পড়তা মানের সিনেমা, যা বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিছু ভালো ভিজ্যুয়াল থাকা সত্ত্বেও গল্প, চিত্রনাট্য এবং অভিনয়ের দুর্বলতা এটিকে একটি হতাশাজনক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে। আর এর দায় ছবির পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদকেই নিতে হবে এককভাবে।

বাংলাদেশের সিনেমার বাজারের প্রেক্ষাপটে তিনি সিনেমা হিট করার প্রধান যে উপকরণগুলো- শাকিব খান, বিগ বাজেট পেয়েছেন। কিন্তু সেগুলোর প্রতি একদমই ইনসাফ দেখাতে পারেননি। জীবনে প্রথমবার সিনেমা বানাতে এসেই ডুবিয়েছেন নিজের নির্মাণের সুনাম। বলা যায়, হারিয়েছেন সিনেমাপাড়ার আস্থাও।

শেষ কথায়, দর্শক যদি নতুন কিছু বা ভিন্ন স্বাদের সিনেমা দেখতে চান, তাহলে ‘প্রিন্স’ হয়তো তাদের জন্য সঠিক পছন্দ হবে না। তবে যারা একেবারেই হালকা বিনোদন খুঁজছেন, তারা হয়তো একবার দেখে নিতে পারেন- কিন্তু প্রত্যাশা কম রাখাই ভালো।

এসএ/টিকে

মন্তব্য করুন