© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রাজনীতিতে আসতে চাপ দেওয়ায় মা-বাবার বিরুদ্ধে করেছিলেন মামলা, সেই থালাপতিরই নির্বাচনে বাজিমাত

শেয়ার করুন:
রাজনীতিতে আসতে চাপ দেওয়ায় মা-বাবার বিরুদ্ধে করেছিলেন মামলা, সেই থালাপতিরই নির্বাচনে বাজিমাত

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:১৮ পিএম | ০৫ মে, ২০২৬
তামিলনাড়ুর নির্বাচনে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বিজয়-এর অভিষেকই অনেককে চমকে দিয়েছে। ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮টিতে জয় পেয়ে তার দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

তার এই সাফল্যকে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৫১ বছর বয়সী বিজয় তামিল সিনেমার অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ, আর তার এই জনপ্রিয়তাই দলের সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, “২৩৪টি আসনেই প্রার্থী হচ্ছেন বিজয় নিজেই।”

নির্বাচনী ফলাফলের দিক থেকে তার রাজনৈতিক যাত্রা সফল হলেও শুরুটা ছিল বেশ নাটকীয়। মাত্র ছয় বছর আগে তার বাবা-মা যখন তাকে রাজনীতিতে আনতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধেই আদালতে যান। পরে ২০২৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকে প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৮৪ সালে তার বাবা এস এ চন্দ্রশেখর-এর পরিচালনায় ‘ভেট্টি’ সিনেমার মাধ্যমে শিশু অভিনেতা হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়। প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেতা হিসেবে প্রথম দিকে তেমন সাফল্য না পেলেও ১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সেন্থুরপান্ডি’ সিনেমা তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা বিজয়কান্ত-ও অভিনয় করেছিলেন। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি রোমান্টিক ও পারিবারিক ঘরানার জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। পরে অ্যাকশনধর্মী ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে ভক্তদের কাছে ‘থালাপাতি’ উপাধি অর্জন করেন।

তামিল ও তেলুগু চলচ্চিত্রে তারকাদের প্রতি ভক্তদের ভক্তি প্রবাদপ্রতিম হলেও বিজয়ের ভক্তদের একাগ্রতা ছিল ভিন্ন মাত্রার। কয়েক দশক ধরে ছোট শহর ও গ্রামগুলোতে তার ফ্যান ক্লাবগুলো রক্তদান কর্মসূচির মতো বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে আসছিল। 'অল ইন্ডিয়া থালাপাতি বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম'-এর ব্যানারে এসব কাজ পরিচালিত হতো। ফলে রাজনৈতিক দল গঠনের শুরুতেই তিনি একটি সুসংগঠিত ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠন পেয়ে যান।

ভক্তদের এই ভালোবাসা দ্রুত রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করা বিজয়ের জন্য অস্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু তার মধ্যে কিছুটা সংশয় ছিল। ২০২৩ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে চলচ্চিত্রের এক সূত্র জানিয়েছিলেন, ২০০৯ সালে ভক্তদের সংগঠন তৈরির মাধ্যমেই তার বাবা রাজনৈতিক পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু বিজয় সবসময়ই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন, রাজ্যে বড় কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তিনি রাজনীতির কথা ভাববেন না। তবে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং এআইএডিএমকে নেতা এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামীর আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি এবার মাঠে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

বড় পর্দায় আমজনতার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা দিলেও বাস্তবে বিজয় অত্যন্ত লাজুক এবং প্রচারবিমুখ। এই সীমাবদ্ধ যোগাযোগের কারণে তার বাবা চন্দ্রশেখরই ছিলেন বিজয়ের রাজনৈতিক অভিষেকের পেছনের প্রধান কারিগর। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে যখন বিজয়ের সিনেমাগুলো রাজনৈতিক সমালোচনা ও মন্তব্যের কারণে বিতর্কে জড়িয়েছে, বিজয় চুপ থাকলেও তার বাবা প্রকাশ্যে সেগুলোর জবাব দিতেন।

২০২০ সালে চন্দ্রশেখর বিজয়ের অনুমতি ছাড়াই 'বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম' (ভিএমআই) কে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করেন। সেখানে চন্দ্রশেখর নিজেকে সাধারণ সম্পাদক এবং বিজয়ের মা গায়িকা শোভাকে কোষাধ্যক্ষ মনোনীত করেন। চন্দ্রশেখর তখন যুক্তি দিয়েছিলেন, বিজয়ের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেও তিনি অনুমতি ছাড়াই ফ্যান ক্লাব করেছিলেন। পরবর্তীতে বিজয়ের মা শোভা জানান, কেবল বিজয়ই তার রাজনৈতিক প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেবেন এবং তিনি তার স্বামীর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বিজয় প্রকাশ্যে নিজেকে ভিএমআই থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং নিজের বাবা-মাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে ভিএমআই বিলুপ্ত করা হয়। এর প্রায় এক বছর পর তার ফ্যান সংগঠনের সদস্যরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১১৫টিতে জয়ী হলে রাজনীতিতে বিজয়ের পরোক্ষ প্রবেশ ঘটে।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন একটি দলের জন্য জায়গা তৈরি হওয়া মাত্রই বিজয় মাঠে নামেন। ২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পর রাজ্যের প্রধান দুই দলের একটি এআইএডিএমকে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। শক্তিশালী সংগঠন থাকা সত্ত্বেও নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। অন্যদিকে বিজয় সুকৌশলে ডিএমকে-র বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং বিজেপির বিরুদ্ধে তাদের আদর্শগত অবস্থানের অভিযোগ তুলে ধরেন। তরুণ ও নারীদের মধ্যে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা এই জয়ের পেছনে বড় কাজ করেছে।

অভিজ্ঞতা এবং আদর্শিক অস্পষ্টতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও নির্বাচনের ফলাফল বলছে বিজয়ের রাজনৈতিক সময়জ্ঞান এবং পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই কাজ করেছে।

এবি/টিএ

মন্তব্য করুন