© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের বাড়ি-সড়ক-রেললাইন

শেয়ার করুন:
সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের বাড়ি-সড়ক-রেললাইন

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:৩০ এএম | ২৫ মে, ২০২৬
জলবায়ু সংকট ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়িঘর, সড়ক ও রেললাইন ধীরে ধীরে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে হাজার হাজার বাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়বে, অথচ এই সংকট মোকাবিলায় এখনো কোনো সুদূরপ্রসারী জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি হয়নি।

দক্ষিণ ডেভনের টরক্রস ও স্ল্যাপটনের মধ্যবর্তী স্ল্যাপটন লাইন নামের উপকূলীয় সড়কের একটি অংশ চলতি বছরের শীতকালীন ঝড়ে ধসে পড়েছে। একপাশে মিষ্টি জলের হ্রদ এবং অন্যপাশে সমুদ্রঘেরা এই সড়কটি কিংসব্রিজ ও ডার্টমাউথ শহরকে সংযুক্ত করত। বহু বছর আগে থেকেই এর ধ্বংসের আশঙ্কা করা হলেও প্রতিরোধমূলক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়ক ধসে পড়ায় পর্যটন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সি ভিউ ক্যাম্পসাইটের মালিক গিল স্টেরি বলেন, “খুবই উদ্বেগের বিষয় যে কিছুই করা হচ্ছে না। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও রাস্তাটির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। আমাদের মনে হচ্ছে, আমাদের ভুলে যাওয়া হয়েছে।”

ডেভন কাউন্টি কাউন্সিলের পরিবহনবিষয়ক কর্মকর্তা ড্যান থমাস জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি পুনর্নির্মাণে প্রায় ১৮ মিলিয়ন পাউন্ড লাগতে পারে, যা কাউন্সিলের জন্য বড় আর্থিক চাপ। তিনি বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কোনো বড় জাতীয় মহাপরিকল্পনা নেই।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়র্কশায়ারের ইস্ট রাইডিং, উত্তর নরফোক, সাফোক এবং আইল অব ওয়াইট। ইয়র্কশায়ারের হোল্ডারনেস উপকূলে প্রতিবছর গড়ে ৪.৫ মিটার পর্যন্ত ভূমি সরে যাচ্ছে, যা ইউরোপের অন্যতম দ্রুততম উপকূল ক্ষয়ের উদাহরণ।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৮০ বছরে উপকূলীয় ভাঙনের কারণে অন্তত ১০ হাজার সম্পত্তি ঝুঁকিতে পড়বে, কিছু অনুমানে এ সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ কিলোমিটার রেললাইন ও ১১৪ মাইল সড়কও হুমকির মুখে রয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় উপকূলরেখা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলো মূলত তিন ধরনের কৌশলের ওপর নির্ভর করছে- ‘লাইন ধরে রাখা’, ‘নিয়ন্ত্রিত পুনর্বিন্যাস’ এবং ‘কোনো সক্রিয় হস্তক্ষেপ নয়’। কোথাও সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোরদার করা হচ্ছে, আবার কোথাও উপকূলকে স্বাভাবিকভাবে সরে যেতে দেওয়া হচ্ছে।

সরকার বর্তমানে ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ডের কয়েকটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালাচ্ছে, যা পরে আরও ১৮ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করা। তবে এখনো যেসব মানুষ উপকূল ভাঙনে বাড়িঘর হারাচ্ছেন, তাদের জন্য কার্যকর ক্ষতিপূরণ বা বীমা ব্যবস্থা নেই।

নরফোকে পরিচালিত ‘কোস্টওয়াইজ’ প্রকল্পের গবেষক সোফি ডে বলেন, বাড়িঘর ভেঙে ফেলার দৃশ্য অনেক পরিবারের জন্য শোকের মতো অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, সম্প্রতি হ্যাপিসবার্গ এলাকায় দুই নারীর বাড়ি ভেঙে ফেলা হলে তারা ঘটনাস্থলে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার ভাষায়, “নিজের বাড়ি হারাতে দেখা মানুষের জন্য গভীর মানসিক আঘাত।”

আইল অব ওয়াইট কাউন্সিলের পরিবেশ কর্মকর্তা নাতাশা ডিক্স জানান, উপকূলীয় ভাঙনের ঘটনাগুলো এখন ‘দুর্যোগ পর্যটনে’ রূপ নিচ্ছে। ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট নির্মাতা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা ভুক্তভোগীদের জন্য আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠছে।

ডেভনের টরক্রস এলাকাকে উপকূলরেখা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় ‘লাইন ধরে রাখার’ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে সমুদ্র প্রতিরক্ষা উন্নয়নে ১৯.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছে পরিবেশ সংস্থা। তবে ধসে পড়া স্ল্যাপটন লাইন সড়কটি পুনর্নির্মাণে সরকার অর্থায়ন করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু জানানো হয়নি।

অন্যদিকে ইয়র্কশায়ারের কিছু উপকূলীয় এলাকাকে ‘কোনো সক্রিয় হস্তক্ষেপ নয়’ অঞ্চল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সেসব অঞ্চলে উপকূলীয় ভাঙন ঠেকাতে নতুন কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হলে আগামী দশকগুলোতে হাজার হাজার বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সমুদ্রে হারিয়ে যেতে পারে।

সূত্র: গার্ডিয়ান

এসকে/টিএ

মন্তব্য করুন