ইরান ‘বিশ্বের শয়তানদের নতজানু করেছে’: মোহসেন রেজাই
ছবি: সংগৃহীত
০৫:২০ পিএম | ১৯ জুন, ২০২৬
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির একজন ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেছেন যে, ‘গর্বিত ও বিজয়ী ইরানি জাতি বিশ্বের শয়তানদের নতজানু করেছে এবং তাদের আধিপত্য চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে’। কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রেক্ষিতে এ কথা বলেন ইরানি এই কর্মকর্তা।
আজ শুক্রবার (১৯ জুন) এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এই মহাকাব্য ইতিহাসে চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে।’ রেজাই আরও লেখেন যে, ইরান ‘আমাদের শহীদ নেতার রক্তের জন্য শোকাহত এবং এই ক্ষতের জন্য প্রতিশোধ ছাড়া আর কোনো প্রলেপ নেই’।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হন।
পরমাণু ইস্যুতে চলমান পরোক্ষ আলোচনার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একসঙ্গে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। জবাবে ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে তীব্র ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শুরু করে ইরান। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
তবে একই সময়ে লেবাননে সংঘাত অব্যাহত থাকে। ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলায় সেখানে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরল সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। এরপর ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে।
১৪ এপ্রিল লেবানন ও ইসরাইল কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করে এবং ১৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। কিন্তু হিজবুল্লাহ ওই আলোচনার অংশ না হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
২১ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ান, এ সময় পরোক্ষ আলোচনা চলতে থাকে। ৭ জুন ইসরাইল বৈরুতে বোমা হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। পরদিন ইসরাইল মধ্য ও পশ্চিম ইরানে বিমান হামলা চালায়।
৯ জুন হরমুজ প্রণালীতে একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করে। পাল্টাপাল্টি হামলা পরবর্তী দিনও অব্যাহত থাকে।
১৪ জুন ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার ঘোষণা দেন। গত বুধবার ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে নিশ্চিত করেছে যে, বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠক হবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইতোমধ্যে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তার প্রতিনিধি দলকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য পাঠাতে বিলম্ব করছে। এর কারণ হিসেবে লেবাননে ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বুধবার (১৭ জুন) এটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের পক্ষে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এতে স্বাক্ষর করেন। এতে লেবাননে যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ থাকলেও ইসরাইল তা তোয়াক্কা করছে না।
দক্ষিণ লেবাননে গত রাতভর ও আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চলা হামলায় কমপক্ষে ১৮ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। লেবাননে ইসরাইলের এই হামলার পর ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, যেকোনো আলোচনা তেহরানের ‘রেড লাইনের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। লেবাননে ইসরাইলের হামলা বন্ধ করা ছিল আলোচনায় তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি।
‘যদি শত্রু অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়, তাহলে আমরা প্রমাণ করেছি যে আমাদের আঙুল ট্রিগারে রাখা আছে এবং শত্রুকে চূর্ণকারী জবাব দিতে আমরা কোনো দ্বিধা করব না’, বলেন গালিবাফ।
এদিকে চুক্তির স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে মিশরের আলামেইন শহরে রোববার (২১ জুন) মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছে কায়রো ও ইসলামাবাদ।
এমআর/টিকে