ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৯৪৩
ছবি: সংগৃহীত
১১:২৯ এএম | ০১ জুলাই, ২০২৬
ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের ছয় দিন পরও উদ্ধার অভিযান চলছে। দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৪৩ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ।
তিনি আরা জানান, লা গুয়াইরায় ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে যারা নিজেরা বেরিয়ে আসতে পেরেছেন বা স্বজনদের সহায়তায় উদ্ধার হয়েছেন, তাদের যুক্ত করলে এই সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার হতে পারে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য সংগ্রাম করছিলেন। এর মধ্যেই রাজধানী কারাকাসে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৩ বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে বহু আবাসিক ভবন ধসে পড়ে, হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায় এবং ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
উদ্ধারের আশা যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছিল, তখন জর্ডানের একটি সিভিল ডিফেন্স দল কারাকাসের একটি ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩ বছরের শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে উদ্ধারকর্মীদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়। জর্দানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল।
ভূমিকম্পের পর জীবিত উদ্ধার পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা গত শনিবার শেষ হয়ে গেছে। তবুও বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, রাজধানী কারাকাসের উত্তরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বন্দরনগরী লা গুয়াইরায় খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সেখানে মৌলিক সেবাগুলো ভেঙে পড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
লা গুয়াইরার ১৮ বছর বয়সী বিক্রেতা ড্যানিয়েলা আরমাস বলেন, ‘এখানে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, কিন্তু খাবারের জন্য মানুষ প্রায় মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে।’ দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে সরকারের ধীর প্রতিক্রিয়ায় অনেক ভেনেজুয়েলান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা আগামী ছয় মাসে ৩০ হাজার মানুষের জন্য ত্রাণ ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার সহায়তা চেয়েছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে। এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেইয়ার সতর্ক করে বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা চরম চাপের মুখে রয়েছে। ভূমিকম্পের আগে টিকাদানের হার কম থাকায় হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিও বেড়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল প্রশিক্ষিত কুকুর ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে জীবিতদের খোঁজে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে অনেক ভেনেজুয়েলান তাদের স্বজনদের দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেক মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপ, হাসপাতাল ও মর্গে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার যন্ত্রণা তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
নিজের বোন সোরাইদাকে খুঁজতে থাকা রোসানা লুনা বলেন, ‘কিছুই না জানাটা সবচেয়ে কঠিন। তখন বারবার মনে হয়, আমি কী করব? কোথায় তাকে খুঁজব?’
বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা সোমবার লা গুয়াইরা বন্দরের কাছে অস্থায়ী মর্গের সামনে সারিবদ্ধ কালো মরদেহের ব্যাগ দেখতে পান। সেখানে অনেক মানুষ স্বজনদের খোঁজে বা মরদেহ শনাক্ত করতে ভিড় করছিলেন। ৩৭ বছর বয়সী ডারভিন সিলভা জানান, ধসে পড়া একটি ভবনের নিচে আটকা পড়া তার মায়ের মরদেহ উদ্ধারে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘খালি হাতে, হাতুড়ি ও খননযন্ত্র দিয়ে তাকে বের করতে যে পরিমাণ কষ্ট করতে হয়েছে, তা কল্পনাও করা যায় না।’ মায়ের মরদেহ উদ্ধারের পর আবেগাপ্লুত ডারভিন বলেন, ‘এখন অন্তত আমি তাকে প্রাপ্য শান্তিতে বিদায় জানাতে পারব।’
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের ছয় দিন পরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন। উদ্ধারকারীরা এখনও জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশা নিয়ে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের মতে, ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুর্যোগে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের সমান।
উদ্ধার কাজে সহায়তার জন্য বিশ্বের ২৭টি দেশ প্রায় ৪০টি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। জাতিসংঘের ভেনেজুয়েলা সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোল্লা জানান, এসব দলে ২ হাজারের বেশি সেনা ও উদ্ধারকর্মী এবং ১৬০টিরও বেশি প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর রয়েছে।
মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় জাতিসংঘ ১০ হাজার মরদেহের ব্যাগ সরবরাহ করছে। তবে সংস্থাটি আশা করছে, চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা এর চেয়ে কম হবে। রাজধানী কারাকাসের একমাত্র সরকারি কবরস্থানে দুটি দাহ চুল্লি দিনরাত পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। অন্যদিকে, লা গুয়াইরা বন্দরের অস্থায়ী মর্গে এখনও বহু মানুষ তাদের স্বজনদের মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছেন।
স্বজনদের খোঁজে সেখানে অপেক্ষা করছিলেন উইলকার মোল্লালা। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার সেখানে আছে। আমাকে বলা হয়েছে, আমার বোন ও তার সন্তানরা, পাশাপাশি আমার ভাইয়ের সন্তানরাও সেখানে রয়েছে।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, ‘আমাদের পরিবারে ১১ জন সদস্য ছিল। তাদের মধ্যে শুধু আমরা দুজন বেঁচে গেছি, কারণ ঘটনার সময় আমরা কাজে বাইরে ছিলাম।’ ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে শোক, অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট আরো গভীর হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ এবং অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো খবর জানে না।
আরআই/ এসএন