কলকাতায় ৯ বাংলাদেশির মৃত্যুদমকল সদর দপ্তরের পাশের হোটেলে ছিল না অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা
ছবি: সংগৃহীত
১১:৩৯ এএম | ১৯ আগস্ট, ২০২৬
ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বহুতল হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্যের হোটেলগুলির আগুন নেভানোর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হোটেলের অতিথিদের অনেকেরই অভিযোগ, হোটেলে যথাযথ আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না।
দিন কয়েক আগেই তারাপীঠের একটি হোটেলে আগুন লেগে ৯ জনের মৃত্যু হয়। আবার খোদ কলকাতায় একই ঘটনা ঘটায় উঠছে প্রশ্ন।
প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, নিহতরা চিকিৎসা কিংবা ব্যবসার কাজে কলকাতায় এসেছিলেন। কয়েক জনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
রাত প্রায় ২টা নাগাদ হোটেলের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে বলে প্রাথমিক তদন্তে অনুমান দমকলের। পরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া। ঘুমন্ত আবাসিকদের অনেকেই ঘরের ভিতরে আটকে পড়েন। আগুনের উৎস বা পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় হোটেলের একাধিক অংশ।
কয়েক জনের শরীরে পোড়ার চিহ্ন মিলেছে। তবে মৃত্যুর কারণ আগুনে দগ্ধ হওয়া, নাকি ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ- তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই হোটেলটি আগে একটি আবাসিক ভবন ছিল। কিন্তু গত তিন-চার বছরে তা বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। ভবন দুটো ইংরেজি অক্ষর ‘এল’ আকৃতিতে তৈরি করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে সেই বাড়িটির প্রত্যেক তলায় তৈরি হয় হোটেল। ঘরও ছোট ছোট। মঙ্গলবার রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই বাড়ির তিনতলার একটি হোটেলে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে না পড়লেও মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা বাড়ি।
এই ধরনের বাণিজ্যিক ভবনে জরুরি প্রস্থান গেট থাকা বাধ্যতামূলক। ওই ভবনে সেই রকম কোনও জরুরি প্রস্থান গেট নেই। প্রবেশ এবং বের হওয়ার জন্য একটিই মাত্র গেট। সেটিও খুবই সরু। এই ঘটনার পর হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অতিথিদের দাবি, সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি আগুন লাগার পরও কোনও ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠেনি। ফলে অধিকাংশ আবাসিক আগুনের খবর পান দেরিতে। এক অতিথির দাবি, রাত আড়াইটা নাগাদ হোটেলের এক কর্মী এসে তাদের ঘুম থেকে তুলে আগুনের কথা জানান। কিন্তু নীচে নামার পর বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সরু প্রবেশপথ এবং ধোঁয়ায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়ায় আবাসিকদের মধ্যে। পরে দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে একে একে তাদের বাইরে বের করে আনেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। এক আবাসিকের কথায়, হোটেলের ভিতর এতটাই ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল যে সামনে কী রয়েছে, তা দেখা যাচ্ছিল না। শ্বাস নিতেও সমস্যা হচ্ছিল। দমকলকর্মীদের হস্তক্ষেপেই তারা বেরিয়ে আসতে পেরেছেন বলে দাবি তার। ঘটনার পর নিউমার্কেট এলাকার অন্য হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অনেক হোটেলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলি কার্যকর কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। কোথাও আবার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাই নেই। তারাপীঠের ঘটনার পর মাত্র দু’দিনের মধ্যে কলকাতায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
ঘটনাস্থলের কাছেই রয়েছে নিউমার্কেট থানা, কলকাতা পৌরসভা এবং খাদ্যভবন। ফলে প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যে থাকা দমকল সদর দপ্তরের কাছের এলাকায় কী ভাবে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম উপেক্ষা করে হোটেল চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। নিউমার্কেটের অন্যান্য হোটেলেও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে। কেন এসব এত দিনেও রাজ্য প্রশাসনের নজরে আসেনি, বা বহুতলে হোটেল ব্যবসা চালানোর জন্য দমকলের ছাড়পত্র আদৌ হোটেল মালিকদের কাছে ছিল কিনা- এসব নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
তারাপীঠ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন দুই বন্ধু। তাদের একজন আমিরুল করিমের দাবি, আগুন লাগার পর ধোঁয়ার কারণে হোটেলের ভিতরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কোনও মতে প্রাণ বাঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন তারা। ওই ঘটনার আতঙ্ক এখনও কাটেনি বলেও জানান তিনি। অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলের আবাসিকদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ছয় জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে।
পরপর অগ্নিকাণ্ড এবং প্রাণহানির পর ফের সামনে এসেছে একই প্রশ্ন- নিরাপত্তা বিধি থাকা সত্ত্বেও কেন তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না? হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পরিদর্শন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, এই অগ্নিকাণ্ডের পর সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে প্রশাসন। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, ‘কী করে এই হোটেলগুলো পারমিট পেল, ট্রেড লাইসেন্স পেল, সেটা তদন্ত করে দেখা খুবই প্রয়োজন। আমরা সব খতিয়ে দেখে কড়া ব্যবস্থা নেব। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দিকে নজর রেখেছেন।’ বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক অভিযোগ করেছেন, ভবনটির মূল কাঠামো আবাসিক ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও পরে বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তার দাবি, হোটেলের ঘর বাড়ানোর জন্য ভবনের পিলার পর্যন্ত কাটা হয়েছিল। এতে কাঠামোগত ভাবে ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ তার।
কেএন/এসএন