© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

বাংলা কিউআর অপব্যবহার করে ক্যাশ আউটের অবৈধ ব্যবসা!

শেয়ার করুন:
বাংলা কিউআর অপব্যবহার করে ক্যাশ আউটের অবৈধ ব্যবসা!

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৯:২২ পিএম | ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিছু দোকানে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেও গ্রাহকের কাছ থেকে বাংলা কিউআর দিয়ে মার্চেন্ট পেমেন্ট গ্রহণ করছে। যদিও গ্রাহক দোকানে আসছেন এমএফএস ক্যাশ আউট করতে, কিন্তু দোকানি গ্রাহককে বিভ্র‌ান্ত করে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট দিয়ে ক্যাশ আউট না করিয়ে বাংলা কিউআর দিয়ে মার্চেন্ট পেমেন্ট করাচ্ছেন। এখানে দোকানদারের লক্ষ্য একটিই- অবৈধভাবে ক্যাশ আউট করিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আয়, যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, মানে এজেন্ট বা মার্চেন্ট অধিক লাভের আশায় সচেতনভাবে অবৈধ লেনদেনে জড়ালেও, বহু গ্রাহক নিজের অজান্তেই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে ‘মানি লন্ডারিং’-এর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এই ধরনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে দেশজুড়ে এমএফএস এজেন্ট পয়েন্টগুলোয় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাংলা কিউআর কোড বসানোর পর থেকে।

এমন ঘটনা দেখা গেলো রাজধানীর মালিবাগ বাজার সংলগ্ন এলাকায়। এক তরুণ এজেন্ট পয়েন্টে এসেছেন ১০,০০০ টাকা ক্যাশ আউট করতে, কিন্তু দোকানি এমএফএস সেবার মাধ্যমে ক্যাশ আউটের বদলে একটি ব্যাংকের বসানো বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা (পেমেন্ট) দিতে বললেন। এজেন্টের কথামত গ্রাহক তার এমএফএস অ্যাপ দিয়ে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট দিয়ে দিলেন, যদিও সেই তরুণ বুঝলেনও না তিনি কি ক্যাশ আউট করলেন নাকি পেমেন্ট দিলেন! 

কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্টে গ্রাহকের কোনো খরচ নেই, কিন্তু ওই এমএফএস এজেন্ট যেহেতু এই অর্থ ক্যাশ আউটের লক্ষ্যে গ্রহণ করেছেন, তাই গ্রাহকের কাছ থেকে তিনি ক্যাশ আউট খরচও কেটে রেখেছেন। এখানে তিনি ৩টি অপরাধ করেছেন- এক, কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেও পেমেন্ট গ্রহণ করা; দুই, পেমেন্টে চার্জ না থাকলেও গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউট চার্জ আদায় করা; এবং তিন, ক্যাশ আউটের উপর সরকার নির্ধারিত ১৫% ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন।

এখন দেখা যাক এই ধরনের লেনদেনে কি ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে-

প্রথমত, কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেই বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে পেমেন্ট দেওয়ায় আইন অনুযায়ী এটি ‘মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার’ হিসেবে পরিগণিত হবে। যার দায় পড়তে পারে- বাংলা কিউআর কোড বসানো কোম্পানি, এজেন্ট বা মার্চেন্ট এবং গ্রাহক – তিন পক্ষের উপরেই।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ লেনদেনে জড়িয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর এজেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট বাতিল হওয়ার পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে।

তৃতীয়ত, এই মার্চেন্ট বা এজেন্ট জড়িয়ে পড়তে পারেন জুয়া, হুন্ডি, অনলাইন প্রতারণা-জালিয়াতি করা অসাধু চক্রের সঙ্গে, যা তাদের জন্য তৈরি করবে আরও কঠোর আইনি জটিলতা।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ১০ আগস্ট দেয়া এক ‍নির্দেশনায় বলা হয়েছে - কোনো মার্চেন্টের অস্বাভাবিক সংখ্যক বা অস্বাভাবিক ধরনের লেনদেন পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট একুয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে তা পর্যবেক্ষণ, যাচাই ও পর্যালোচনা করতে হবে এবং কৃত্রিমভাবে লেনদেন বিভাজন, ক্যাশ আউট বা অন্য কোনো ধরনের অপব্যবহার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার করে অবৈধ লেনদেন এবং আইনি সংকট যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে একই দোকানে এজেন্ট এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট দেয়া থেকে বিরত ছিলো। কিন্তু, বাংলা কিউআর ব্যবস্থা চালুর পর ‘এমএফএস এজেন্ট’-এর ব্যবসায়িক মডেল বিবেচনায় না নিয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান বাছবিচার না করেই বহু এজেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর স্থাপন করেছে। এটি দেশের ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়ন না ঘটিয়ে বরং বিভিন্ন অবৈধ লেনদেনের সুযোগ তৈরি করছে।

এমএফএস সেবা, যা দেশের ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা সীমিত ব্যাংকিং সেবা পাওয়া বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এনেছে, তা সম্ভব হয়েছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই এজেন্ট নেটওয়ার্কের কল্যাণে। তাই এখন মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের বিপরীতে দেয়া বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে অবৈধ ক্যাশ আউট ব্যবসার প্রসার ঘটলে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখ লাখ এমএফএস এজেন্ট যা আদতে প্রান্তিক মানুষের আর্থিক সেবা পাওয়ার অধিকারকেই সংকুচিত করবে।

এমআর/টিএ  

মন্তব্য করুন