দেশে সক্রিয় হয়েছে নতুন ধরনের একটি প্রতারণামূলক চক্র। নিজেদেরকে স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক কোম্পানি পরিচয় দিয়ে “ওয়াকহাব (Walkhub.uk)” নামের একটি ভুয়া প্ল্যাটফর্ম তরুণদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ পেতেছে।
ওয়াকহাব দাবি করছে, তাদের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে হাঁটার মাধ্যমে “নাটস” নামের একটি ভার্চুয়াল উপাদান উৎপাদন হয়, যা বিক্রি করে মোটা অঙ্কের আয় করা সম্ভব। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই “নাটস” আসলে কোনো বাস্তব পণ্য নয়; কেবলমাত্র একটি কল্পিত বিষয়। কোম্পানিটি মূলত পিরামিড স্কিম বা মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (MLM) পদ্ধতিতে মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করছে।
অনুসন্ধান
সাংবাদিক নাবিল খান সম্প্রতি ওয়াকহাবের মি. নাহিদের সাথে কথা বলেন। যিনি নিজেকে কোম্পানির "হেড অফ ট্রেইনার" বলে দাবি করেন। কথোপকথনে নাহিদ স্বীকার করেন যে কোম্পানির বাংলাদেশে কোনো অফিস নেই, সরকারের অনুমোদনও নেই। তবুও তারা তরুণদের বিভিন্ন “প্ল্যান” কিনতে বাধ্য করছে—যার মধ্যে সর্বোচ্চ প্ল্যানের মূল্য ৮০ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, বিনিয়োগকারীরা যদি কাজ না করতে চান, তবে টাকাও ফেরত নিতে পারবেন, তবে সেক্ষেত্রে কোম্পানি ১৫% টাকা কেটে নেবে। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি আসলে ভুয়া নিরাপত্তার কৌশল। তারা কোন লিখিত চুক্তিও করে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যারা ওয়াকহাবের নতুন প্ল্যান বিক্রি করতে ব্যর্থ হন, তাদের অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ বা ব্লক করে দেয়। ইতিমধ্যেই শত শত মানুষের অ্যাকাউন্ট এভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন প্রতারিত ভুক্তভোগী তাহাজীব হাসান।
তিনি জানান, “আমি প্রতিষ্ঠানটির ৮০ হাজার টাকার একটি প্ল্যান কিনেছিলাম। কিছুদিন পর বুঝতে পারি, ওয়াকহাব মূলত পিরামিড স্কিমের মাধ্যমে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। বিষয়টি বুঝতে পারার পর আমি আর নতুন কারও কাছে কোনো প্ল্যান বিক্রি করিনি। এর ফলেই আমার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমার বিনিয়োগকৃত অর্থও ফেরত দেয়নি।”
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতামত
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকির আহমেদ এর মতে, মোবাইলে হাঁটার মাধ্যমে কোনো “নাটস” বা “হ্যাশ রেট” উৎপাদন সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতারণার গল্প। মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা এনে কিছুদিন ফেরত দেওয়া হয়, যাতে তারা আরও মানুষকে যুক্ত করতে আগ্রহী হয়। পরবর্তীতে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেলে কোম্পানি উধাও হয়ে যায়। তখন নতুন বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হন।
পূর্বের অনুরূপ ঘটনা
এর আগেও ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, যুবক, ডেস্টিনি’র মতো প্রতারণামূলক স্কিম হাজার হাজার মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে। ওয়াকহাবও একই কৌশলে মানুষের স্বপ্ন ভাঙতে উদ্যত হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সতর্কবার্তা
হাইকোর্টের আইনজীবি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলছেন, কোনো বিদেশি কোম্পানি যদি বাংলাদেশে অফিস, লাইসেন্স বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই টাকা লেনদেন করে, তা সরাসরি অবৈধ। ওয়াকহাবের কার্যক্রম সেই অবৈধতার স্পষ্ট প্রমাণ।
তিনি আরো বলেন, বেকার তরুণ-তরুণীদের প্রতি অনুরোধ—অবাস্তব লোভনীয় আয়, “অ্যাপের মাধ্যমে টাকা বানানো”, বা “ভার্চুয়াল পণ্য বিক্রি”র নামে কোনো প্রলোভনে পা দেবেন না। এগুলো মূলত সুপরিকল্পিত প্রতারণা।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে যে এটি ব্রিটেনে নিবন্ধিত এবং ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার তাদের আর্থিক লেনদেনের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে।