বিখ্যাত বাবার সন্তান হিসেবেই এতদিন ছিল মূল পরিচিত। জিনেদিন জিদানের ছেলে আলজেরিয়ার হয়ে খেলছেন, ফুটবলবিশ্বে এটি ছিল বড় খবর।সেই ছেলে এখন ক্রমেই উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন আপন আলোয়। আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে দুর্দান্ত পারফর্ম করে নজর কেড়েছেন লুকা জিদান।
আফ্রিকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচেই জিতেছে আলজেরিয়া। এখনও পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি দুবারের চ্যাম্পিয়নরা। সেই কৃতিত্ব অনেকটাই পাচ্ছেন গোলকিপার লুকা।
প্রথম ম্যাচে সুদানকে ৩-০ গোলে হারায় আলজেরিয়া। পরের ম্যাচে তারা ১-০ গোলে জেতে বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে। দুই ম্যাচেই দারুণ কিছু সেভ করেন লুকা। বিশেষ করে, দ্বিতীয় ম্যাচে তার পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত।
টুর্নামেন্টের সবশেষ দুই আসরে ছয় ম্যাচের স্রেফ একটিতে ‘ক্লিন শিট’ রাখতে পেরেছিল আলজেরিয়ার। দুবারই বাদ পড়েছিল তারা গ্রুপ পর্ব থেকে। এবার দুই ম্যাচেই নিশ্চিত করে ফেলেছে শেষ ষোলো।
কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ বললেন, আলজেরিয়ার এই সাফল্যে বড় অবদান রেখেছেন লুকা। “দুটি জয়েই উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে জিদান। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হচ্ছে সে এবং দ্রুতই দলের সঙ্গে মিশে গেছে।”
লুকার মূল কৃতিত্ব হয়তো এখানেই। দলে একাত্ম হতে সময় খুব বেশি নেননি তিনি। বাবার মতোই লুকার জন্ম ফ্রান্সে। তার বেড়ে ওঠা ও ফুটবলের পথে এগিয়ে চলা স্পেনে, রেয়াল মাদ্রিদের একাডেমিতে। তবে জাতীয় দলের ক্ষেত্রে তিনি ফিরে গেছেন তার শেকড়ে। বেছে নিয়েছেন আলজেরিয়াকে। তার দাদা ইসমাইল ও দাদি মালিকা আলজেরিয়ার যুদ্ধের আগে ১৯৫৩ সালে স্বদেশ ছেড়ে পাড়ি জমান ফ্রান্সে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার হয়ে খেলার আনুষ্ঠানিক অনুমতি পান লুকান। দুই সপ্তাহ পর বিশ্বকাপ বাছাইয়ের আলজেরিয়া দলে সুযোগ পান তিনি। অক্টোবরের মাঝামাঝি উগান্ডার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে অভিষেক হয় দাদার দেশের হয়ে। দ্রুত ছুটে চলার সেই পথে এখন তিনি খেলছেন আফ্রিকার সেরা হওয়ার মঞ্চে।
লুকা যেভাবে দলের সঙ্গে দ্রুত মিশে গেছেন, তাতে কোচের মতো মুগ্ধ আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার রায়ান আইত-নুরি। লুকা অসাধারণ ছেলে। খুব দ্রুত দলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে সে, মাঠে প্রচুর কথা বলে এবং সম্পৃক্ত থাকে। আমাদের জন্য দারুণ সহায়ক হয়ে উঠেছে সে। ব্যক্তি হিসেবে ও ফুটবলার হিসেবে এই দলে দারুণভাবে মানিয়ে যায় সে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে আট বছরের বেশি সময় ধরে খেললেও সত্যিকার অর্থে নিজের নামে পরিচিত হতে শুরু করেছেন তিনি এখন। ছয় বছর বয়সে রেয়াল মাদ্রিদের একাডেমিতে যোগ দেন লুকা। বাবা ছিলেন মাঝমাঠের জাদুকর, অনেক স্মরণীয় গোল তিনি করেছেন। তবে ছেলে বেছে নেন গোল ঠেকানোর কাজকে।
বাবার ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদের একাডেমি ও যুব দলে ছিলেন তিনি ২০ বছর বয়স পর্যন্ত। রেয়ালের ‘বি’ দল হয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন তিনি একসময়। ২০১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ছিলেন তিনি মূল স্কোয়াডে। মাঠে নামার সুযোগ খুব একটা পাননি। সেসময় ধারে খেলেছেন রেসিং সান্তান্দারে।
২০২০ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে পাড়ি জমান তিনি রায়ো ভাইয়েকানোতে। পরে এইবারে দুই মৌসুম খেলে গত বছর গ্রানাদায় যোগ দেন তিন বছরের চুক্তিতে।
বয়সভিত্তিক ফুটবলে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলেছেন লুকা। এখন তিনি আলজেরিয়ার হয়ে আফ্রিকার সেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
সেই পথচলায় গ্রুপের শেষ ম্যাচে বুধবার আলজেরিয়ার প্রতিপক্ষ একুটোরিয়াল গিনি। এর মধ্যেই বিদায় নিশ্চিত হওয়া দলের বিপক্ষেও আরেকটি ‘ক্লিন শিট’ তার প্রত্যাশিতই।
এই টুর্নামেন্ট চলার সময়ই লুকা বলেছেন, মূলত দাদার উৎসাহেই আলজেরিয়াকে বেছে নিয়েছেন তিনি। এই সিদ্ধান্তে বাবাও তার পাশে আছে বলেন জানান ২৭ বছর বয়সী গোলকিপার। ছেলের খেলা দেখতে মরক্কোতে গিয়েছিলেন সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন জিদান।
জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের হয়ে খেলেছেন তিনটি বিশ্বকাপ। শিরোপা জিতেছেন ১৯৯৮ আসরে, রানার্স আপ হয়েছেন ২০০৬ বিশ্বকাপে। সব ঠিকঠাক থাকলে লুকাও আগামী বিশ্বকাপে খেলবেন, আলজেরিয়ার হয়ে। জিনেদিনের চার ছেলের মধ্যে লুকা দ্বিতীয়। তার মা ভেরোনিক ফের্নান্দেস স্প্যানিশ।
লুকার বড় ভাই এন্সো এবং ছোট দুই ভাই তেও ও এলিয়াজও ফুটবলার। তবে কেউ বড় পর্যায়ে যেতে পারেননি সেভাবে। ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার এন্সো রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি হয়ে ‘সি’ দল ও ‘বি’ দলে খেলেছেন নিয়মিত। একসময় মূল স্কোয়াডে জায়গা পেলেও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। পরে খেলেছেন আরও সাত-আটটি ক্লাবে।
২৩ বছর বয়সী মিডফিল্ডার তেও রিয়ালের একাডেমি ও ‘বি’ দল হয়ে এখন খেলছেন স্পেনেরই ক্লাব কর্দোভায়। ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার এলিয়াজ রিয়াল মাদ্রিদ ও রিয়াল বেতিসের একাডেমি হয়ে এখন খেলছেন বেতিসের ‘বি’ দলে।
এমআর/টিএ