২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে এখনো আড়াই বছর বাকি। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই বিশ্বকাপকে ঘিরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাঠের বাইরের রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে ফুটবলেও।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একদল সংসদ সদস্য। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আইন ও অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান না দেখালে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রকেও ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর থেকে বাদ দেওয়া উচিত।
এই বিতর্কের সূত্রপাত চলতি মাসে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার ঘটনায়। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া একের পর এক হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
‘শান্তি পুরস্কার’ থেকে যুদ্ধের হুমকি
গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করে। ফিফার ভাষ্য ছিল, ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার জন্য এ স্বীকৃতি।
কিন্তু এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালায় ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়ায়। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড, বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মেক্সিকো এবং বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প।
এ প্রেক্ষাপটে লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও প্লাইড কামরুর ২৩ জন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এক যৌথ বিবৃতিতে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক আসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিশ্বকাপ বা অলিম্পিক কোনো রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের হাতিয়ার হতে পারে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, মাদুরোকে আটক করা ছিল আইন প্রয়োগমূলক অভিযান। ট্রাম্পের ভাষায়, মাদুরো একজন ‘অবৈধ নেতা’, যিনি মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত।
এদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, অভিযানে আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মানা হয়নি-এ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বিগ্ন।
ফিফা ও অলিম্পিক কমিটির দ্বিমুখী নীতি?
ইউক্রেনে আগ্রাসনের দায়ে রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা ও আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ এমপি ব্রায়ান লেইশম্যান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘রাশিয়ার ক্ষেত্রে যে নিয়ম, আমেরিকার ক্ষেত্রে কেন নয়?’
তবে ফিফা এ বিষয়ে নীরব। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। অলিম্পিক কমিটি স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে মার্কিন অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা দেওয়া হবে না।
আইওসি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘একটি বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে আমাদের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই কাজ করতে হয়।’
সামনে বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনবিষয়ক পরামর্শক জন জেরাফা বলেন, ‘ফিফা ও আইওসির সনদেই শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। প্রশ্ন হলো, সেই নীতি কি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে?’
১১ জুন শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রভাবও পড়তে পারে। ইরান, হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের সমর্থকেরা পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতির এই টানাপোড়েন মাঠের ফুটবলের উত্তেজনাকে ম্লান করে দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পিএ/টিএ