দ্বিতীয় পাসপোর্টের জন্য বিশ্বজুড়ে হিড়িক, সময় থাকতেই লুফে নিন

ভ্রমণপিপাসু এবং প্রবাসীদের কাছে দ্বৈত নাগরিকত্ব সবসময়ই অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে বিদেশের মাটিতে স্থানীয়দের মতো দাপটে চলা, সীমান্তে দীর্ঘ লাইন এড়ানো কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ পাওয়ার জন্য অনেকেই এখন দ্বিতীয় পাসপোর্টের দিকে ঝুঁকছেন।

এমনকি হলিউড তারকা জর্জ ক্লুনিও ২০২৫ সালের শেষ দিকে সপরিবারে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। যারা কোনো স্পন্সর ছাড়াই বিদেশে থাকতে বা কাজ করতে চান, তাদের জন্য দ্বিতীয় পাসপোর্ট যেন এক জাদুর কাঠি।

বর্তমানে যাদের দেশ ছাড়ার তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই, তারাও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একে একটি বিমা বা 'ইনস্যুরেন্স পলিসি' হিসেবে দেখছেন।

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তনের ফলে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ এখন বেশ কণ্টকাকীর্ণ। ২০২৫ সালে ইউরোপের অনেক দেশ বংশসূত্রে বা অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব (গোল্ডেন পাসপোর্ট) পাওয়ার নিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর বার্নি মোরেনো 'এক্সক্লুসিভ সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট' নামে একটি বিল প্রস্তাব করেছেন। এটি পাস হলে মার্কিন নাগরিকদের জন্য অন্য দেশের নাগরিকত্ব রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তবে বিশ্লেষক পিটার স্পিরোর মতে, এটি অনেকটা প্রতীকী প্রস্তাব এবং বড় ধরণের বাধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন হলেও দ্বৈত নাগরিকত্বের জনপ্রিয়তা যে বাড়ছে তার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন জরিপে। যুক্তরাজ্যের ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির ২ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ একাধিক পাসপোর্টধারী। যা আগের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ।

শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে ১২তম অবস্থানে চলে আসায় অনেক মার্কিন নাগরিক এখন বিকল্প খুঁজছেন। গ্যালপ-এর জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন মার্কিনির একজন দেশ ছাড়তে আগ্রহী, যার মধ্যে তরুণীদের হার সবচেয়ে বেশি। হেনলি অ্যান্ড পার্টনারস-এর তথ্যমতে, তাদের বর্তমান গ্রাহকদের একটি বড় অংশই এখন আমেরিকান এবং ব্রিটিশ।

নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রধান পথসমূহ

সাধারণত তিনটি উপায়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব লাভ করা যায়। প্রথমটি হলো বংশসূত্র, যেখানে পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয়। দ্বিতীয়টি হলো ন্যাচারালাইজেশন, যার জন্য নির্দিষ্ট দেশে ৫ থেকে ১০ বছর বৈধভাবে বসবাস, ভাষা ও সংস্কৃতির জ্ঞান এবং সচ্চরিত্রের প্রমাণ দিতে হয়। তৃতীয় পথটি হলো বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব, যা মূলত ধনীদের জন্য। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোনো দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করলে সরাসরি পাসপোর্ট বা বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায়।

সুবিধা ও বিদ্যমান ঝুঁকি

দ্বিতীয় পাসপোর্টের সুবিধা অনেক; এটি অন্য দেশে বসবাসের স্বাধীনতা দেয়, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ায় এবং ভিসা-মুক্ত ভ্রমণের পরিধি বিস্তৃত করে। তবে এর কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশকেই কর দিতে হয়। এছাড়া কিছু দেশে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বা মিলিটারি সার্ভিসের বাধ্যবাধকতা থাকে, যা যুদ্ধের সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার আর্জেন্টিনা বা ইরানের মতো দেশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সহজে স্বীকার করে না।

২০২৫ সালে ইতালি বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম সীমিত করেছে এবং মাল্টার মতো দেশগুলো তাদের গোল্ডেন পাসপোর্ট কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ইউরোপে দরজা বন্ধ হলেও ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এখনো বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দিচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের নাউরু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিশেষ প্রকল্প চালু করেছে। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা ও এল সালভাদর নতুন বিনিয়োগ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসছে।

আইনের কঠোরতা থাকলেও মেধা বা বিশেষ অবদানের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। জর্জ ক্লুনি বা টম হ্যাঙ্কসের মতো ব্যক্তিত্বরা বিশেষ কোটায় নাগরিকত্ব পেয়েছেন।

আইনজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্বের নিয়মগুলো যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। ইতালির সাম্প্রতিক কড়াকড়ি তার বড় উদাহরণ। তাই যাদের যোগ্যতা বা সুযোগ আছে, তাদের জন্য এখনই দ্বিতীয় পাসপোর্টের সুযোগ লুফে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ আজকের যোগ্যতা আগামীকালের পরিবর্তিত আইনে অযোগ্যতা বলে গণ্য হতে পারে।

এমকে/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
জোট নেতাদের খোঁজখবর নিলেন তারেক রহমান Jan 15, 2026
img
মার্কিন হামলার আশঙ্কায় আকাশপথ বন্ধ ঘোষণা করল ইরান Jan 15, 2026
img
মাদারীপুরে ২ পক্ষের সংঘর্ষে অগ্নিসংযোগ ও আহত ৫ Jan 15, 2026
img
পটুয়াখালীতে বিএনপি কার্যালয়ে আগুন Jan 15, 2026
img
বিএনপি থেকে পদত্যাগ, জামায়াতে যোগ দিলেন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি Jan 15, 2026
img
১৫ বছর পর প্রকাশ্যে মডেল মানোহারার সেই বিতর্কিত বিয়ের অজানা অধ্যায় Jan 15, 2026
img
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার মধ্যে ইরানকে কী বার্তা দিল সৌদি? Jan 15, 2026
img
অব্যাহতি চেয়ে জয়-পলকের আইনজীবীর শুনানি আজ Jan 15, 2026
img
ইরানে দূতাবাস বন্ধ করল যুক্তরাজ্য Jan 15, 2026
img
আজ আবারও তিন স্থানে অবরোধের ঘোষণা Jan 15, 2026
img
ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করা হয়েছে, ট্রাম্পের দাবি Jan 15, 2026
img
আজ মিরপুরে ফিরছে বিপিএল Jan 15, 2026
img
কবে মুক্তি পেতে যাচ্ছে ‘পঞ্চায়েত ৫’? Jan 15, 2026
img
নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কথা ভাবতে হবে : রিজওয়ানা হাসান Jan 15, 2026
img
বিশ্বে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ঢাকা Jan 15, 2026
img
ভোলায় যুবককে হত্যা, প্রধান আসামি ঢাকায় গ্রেপ্তার Jan 15, 2026
img
আজ ঢাকার আকাশ থাকবে আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা কত? Jan 15, 2026
img
কোচ পাল্টে দ্বিতীয় বিভাগের দলের কাছেই হারল রিয়াল Jan 15, 2026
img
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারত যাওয়ার পথে ৩ বাংলাদেশি যুবক আটক Jan 15, 2026
img
গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর কথা জানালেন ট্রাম্পের দূত Jan 15, 2026