এই দেশে প্রতিবাদ মানেই কী জনগণকে জিম্মি করা?

বাংলাদেশে কোনো দাবির কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় চিরচেনা দৃশ্য—অবরুদ্ধ রাজপথ, জ্বলন্ত টায়ার, সারি সারি স্থবির যানবাহন আর মানুষের অসহায় মুখ। যেন দাবি আদায়ের একমাত্র স্বীকৃত ভাষা হলো জনজীবনকে স্তব্ধ করে দেওয়া। প্রশ্ন জাগে, এই সাধারণ জনগণ কার শত্রু? কেন প্রতিটি আন্দোলন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের জীবনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাটা নিয়মে পরিণত হয়েছে? 

একটি রাষ্ট্রে রাস্তা কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়, এটি রাষ্ট্রের সচল ধমনী। অথচ আমাদের দেশে এই ধমনী চেপে ধরাই যেন প্রতিবাদের প্রথম কৌশল। যখন একটি অ্যাম্বুলেন্স জ্যামে আটকে থাকে, যখন একজন পরীক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিংবা একজন দিনমজুর তার সারাদিনের কামাই হারায়, তখন সেই প্রতিবাদের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনিবার্য হয়ে পড়ে।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিবাদ সেখানেও হয়, কিন্তু তার রূপ ভিন্ন। জাপানে শ্রমিকরা প্রতিবাদের সময় কাজ বন্ধ করেন না, বরং উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়ে বা অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে তাদের অসন্তোষ জানান দেন। ইউরোপের দেশগুলোতে বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও স্থান নির্ধারিত থাকে, যেখানে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোকে আইনি ও সামাজিকভাবে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। অথচ আমাদের দেশে আন্দোলন মানেই রেললাইন উপড়ে ফেলা, লঞ্চঘাট অচল করা কিংবা শহরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া। আমরা দাবি আদায়ের নামে যখন অন্যের মৌলিক অধিকার হরণ করি, তখন সেটি আর সুস্থ ধারার আন্দোলন থাকে না; বরং তা এক প্রকার ‘নৈতিক সন্ত্রাসে’ রূপ নেয়। এই জিম্মি দশার ফলে যে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় এই জনগণকেই।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো ক্ষমতার ভেতরে থাকলে একরকম আর বাইরে থাকলে অন্যরকম আচরণ করে। ক্ষমতায় থাকাকালীন যারা জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন, ক্ষমতার বাইরে গেলে তারাই আবার রাজপথ অবরোধকে বৈধতা দেন। এই দ্বিচারিতার সংস্কৃতি সাধারণ মানুষকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা শহরে একদিনের পূর্ণাঙ্গ হরতাল বা অবরোধে দেশের জিডিপিতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়। কিন্তু টাকার অঙ্কের চেয়েও বড় ক্ষতি হলো মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আমরা এখন রাস্তায় আগুন দেখলে চমকে উঠি না, মানুষের হাহাকার শুনলে বিচলিত হই না। এই নির্লিপ্ততা প্রমাণ করে যে, জনদুর্ভোগকে আমরা আমাদের জাতীয় জীবনের এক স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছি।

ন্যায্য দাবির পেছনে অবশ্যই যুক্তি থাকে, কিন্তু সেই যুক্তি কি একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবনের চেয়ে বড়? আন্দোলনের নামে যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় বা চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হয়, তখন সেই লড়াই তার জনসমর্থন হারায়। একটি শিশু যখন তার কাঙ্ক্ষিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না, তখন সেই ক্ষোভ কেবল রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত হয়। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এমন এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে, যেখানে জনগণ কেবল ফুটবল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সরকার বলে বিরোধীরা নাশকতা করছে, আর বিরোধীরা বলে সরকার দমন-পীড়ন চালাচ্ছে এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের আড়ালে জনগণের দীর্ঘশ্বাসগুলো সবসময় ঢাকা পড়ে থাকে।

এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তির পথ একদিনে তৈরি হবে না, তবে শুরুটা হতে পারে প্রতিবাদের সংস্কৃতি বদলানোর মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি 'জাতীয় সনদ' বা নৈতিক চুক্তি হওয়া প্রয়োজন যে, দাবি আদায়ের লড়াইয়ে সাধারণ মানুষকে কোনোভাবেই জিম্মি করা যাবে না। সিভিল সোসাইটি ও সংবাদমাধ্যমকে কেবল ঘটনার বর্ণনা না দিয়ে, এই ধ্বংসাত্মক পদ্ধতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে জনগণের পক্ষ থেকে। যেদিন সাধারণ মানুষ বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে 'আমাদের জীবন দিয়ে তোমাদের ক্ষমতার খেলা চলবে না', সেদিনই রাজনীতিকরা পথ বদলাতে বাধ্য হবেন। রাষ্ট্র কি জনগণের, নাকি জনগণ রাষ্ট্রের জিম্মি এই প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া এখন সময়ের দাবি।

Share this news on:

সর্বশেষ

img

ফরিদপুর-১ আসন

আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন আরিফুর রহমান দোলন Jan 15, 2026
img

পে-স্কেল

অবশেষে বেতনের গ্রেড চূড়ান্ত করল কমিশন Jan 15, 2026
img
নানা উপায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করা হচ্ছে: মাহদী আমিন Jan 15, 2026
img
আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা Jan 15, 2026
img

শাকসু নির্বাচন

স্মারকলিপি থেকে স্বাক্ষর প্রত্যাহার করলেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী Jan 15, 2026
img
সপরিবারে যমুনায় পৌঁছেছেন তারেক রহমান Jan 15, 2026
img
বাংলাদেশে আসছে আইসিসির প্রতিনিধি দল! Jan 15, 2026
img
৩ দিনের রিমান্ডে আবেদ আলী Jan 15, 2026
img
জামায়াত ছেড়ে বিএনপিতে মহেশখালীর সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান Jan 15, 2026
img
গত ৮ বছরে কেন কাজ হারিয়েছেন এআর রহমান? Jan 15, 2026
img
নাজমুলকে অর্থ কমিটি থেকে অব্যাহতি যথেষ্ট নয় : মিঠুন Jan 15, 2026
img
সাবেক চিফ হিট অফিসার বুশরা আফরিনকে দেড় ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ দুদকের Jan 15, 2026
img
ভোটকেন্দ্রে ভাষা বিতর্কে জড়ালেন আমির খান Jan 15, 2026
img
পারিশ্রমিক ও পেশাদারিত্ব নিয়ে অভনেত্রী মিমির দৃঢ় অবস্থান Jan 15, 2026
img
যৌথ অভিযান নিয়ে মেক্সিকোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন Jan 15, 2026
img
নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে কোনো লাভ হবে না : রিজওয়ানা Jan 15, 2026
মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলা, কার হাতে ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি? Jan 15, 2026
সিইসির সাথে বৈঠক শেষে যা বললেন সালাউদ্দিন আহমেদ Jan 15, 2026
img
কবে শুরু হচ্ছে আমিরের বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘দাদাসাহেব ফালকে’র শুটিং? Jan 15, 2026
মোস্তাফিজের বিষয়ে প্রতিবাদ না করা নিয়ে যা বললেন ক্রিকেটাররা Jan 15, 2026