অবিশ্বাস্য, অভাবনীয়, হতবাক করা সব ঘটনার দেখা মিলল আফ্রিকান নেশন্স কাপের ফাইনালে। রেফারির সিদ্ধান্তে ক্ষেপে গেল সেনেগালের ফুটবলাররা, সবচেয়ে বেশি যেন মেজাজ হারালেন তাদের কোচ। খেলোয়াড়দের তিনি ডেকে নিলেন ড্রেসিং রুমে। পরে অবশ্য মাঠে ফিরলেন তারা এবং ক্যারিয়ারে হয়তো সবচেয়ে বাজে স্পট কিক নিলেন ব্রাহিম দিয়াস। এরপর অবশ্য লড়াই হলো দারুণ। অনেক বিতর্কের পর, দুর্দান্ত এক গোলে মরক্কোকে কাঁদিয়ে শিরোপা জিতল সেনেগাল।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতে রোববার রাতের ঘটনাবহুল ফাইনালে সেনেগালের জয় ১-০ গোলে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলশূন্য সমতার পর, অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে দর্শনীয় গোলটি করেন পাপ গেয়ি। দ্বিতীয়বার এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জিতল সেনেগাল। প্রথমবার জিতেছিল তারা ২০২১ সালে। মাঝে এক আসর পরই তারা ফিরে পেল আফ্রিকার মুকুট।
আর মরক্কোর অপেক্ষার পালা দীর্ঘ হলো আরও। এই প্রতিযোগিতায় তারা একমাত্র শিরোপাটি জিতেছিল অর্ধশতাব্দী আগে, সেই ১৯৭৬ সালে। ঠিক এক মাস আগে ফিফা আরব কাপ জিতেছিল মরক্কো। দারুণ শক্তিশালী দলটি এখানেও ছিল সম্ভাবনায় এগিয়ে; কিন্তু ঘরের মাঠের বাড়তি সুবিধা কাজে লাগিয়েও শেষ হাসি হাসতে পারল না তারা।
শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে পঞ্চম মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারতো সেনেগাল। সতীর্থের ক্রস গোলমুখে পেয়েও গোলরক্ষক বরাবর হেড নিয়ে হতাশ করেন পাপ গেয়ি। ৩৭তম মিনিটে প্রথমার্ধের সেরা সুযোগটি পায় সেনেগাল। গোলরক্ষককে একা পেয়ে যান ইলিমান; তবে তার কোনকুনি শট এগিয়ে এসে পা বাড়িয়ে আটকে দেন ইয়াসিন বোনো।
চার মিনিট পর দারুণ এক সুযোগ পায় মরক্কোও। কিন্তু বাঁ দিক থেকে ইসমায়েল সাইবারির দুর্দান্ত ক্রস ডি-বক্সে ফাঁকায় পেলেও, বলে মাথা ছোঁয়াতেই পারেননি নায়েফ। প্রথমার্ধে গোলের জন্য মাত্র দুটি শট নেওয়া মরক্কো বিরতির পরের প্রথম ১৫ মিনিটে আরও চারটি শট নেয়; কিন্তু এর কোনোটিই লক্ষ্যে ছিল না। ৫৮তম মিনিটে এল কাবির কাছ থেকে বাঁ পায়ের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
পরের কয়েক মিনিটে আরও তিনবার শট নেয় মরক্কো, এবং প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট। ৬৭তম মিনিটে এক দুর্ঘটনারও শিকার হয় তারা; কর্নারে হেড করতে লাফিয়ে ওঠেন এল আইনাউই, প্রতিপক্ষের একজনের মাথায় লেগে চোখের ওপরের অংশে আঘাত পান তিনি, রক্তও ঝরে; কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। মাঠেই কিছুক্ষণ চিকিৎসা নিয়ে, কপালে ব্যান্ডেজ বেঁধে খেলা চালিয়ে যান।
৮১তম মিনিটে লক্ষ্যে প্রথম শট রাখতে পারে মরক্কো, যদিও আব্দেলের ওই দুর্বল ভলি সরাসরি যায় গোলরক্ষকের গ্লাভসে। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার দারুণ সুযোগ তৈরি করে সেনেগাল; জোরাল কোনাকুনি শটে বোনোকে পরাস্ত করতে পারেননি ইব্রাহিম।
কিছুক্ষণ পর ইদ্রিসা গেয়ির হেড পোস্টে লাগার পর, ফিরতি বল হেডেই জালে পাঠিয়েছিলেন ইসমাইল সার; তবে গোল মেলেনি আগেই রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজানোয়। হেড করার আগে গেয়ি আশরাফ হাকিমিকে ধাক্কা মেরেছিলেন। ধাক্কাটি যদিও তেমন জোরে ছিল না, তাই সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে।
সেটাই আরও বড় হয়ে ওঠে খানিক পর। আট মিনিট যোগ করা সময়ের তখন আর তিন মিনিটের মতো বাকি। কর্নার পায় মরক্কো, বল উড়ে যাচ্ছিল দূরের পোস্টে, সেখানেই ফাউলের শিকার হন রেয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড দিয়াস।
ভিএআরে কথা বলে মনিটরে নিজে দেখার সিদ্ধান্ত নেন রেফারি। কিন্তু সাইডলাইনে তাকে ঘিরে ধরে সবাই, ভিড়ের মাঝেই যাচাই করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত জানান তিনি। এরপর দ্রুত সবকিছু ঘিরে ধোয়াশার জন্ম হয়। মাঠে কিছুক্ষণ সবার বিক্ষিপ্ত ঘোরাফেরার পর, সেনেগাল কোচ পাপ ঝাওকে তার খেলোয়াড়দের চলে আসতে ইশারা করতে দেখা যায়। খানিক পর টানেল ধরে চলেও যায় তারা, রয়ে যান কেবল দলটির তারকা ফুটবলার সাদিও মানে।
অনেক অপেক্ষার পর তারা মাঠে ফিরে আসেন। নেওয়া হয় স্পট কিক এবং দিয়াস যে শটটি নিলেন, তা হয়তো কখনও দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।জায়গা থেকে নড়েননি গোলরক্ষক, দিয়াসের দুর্বল নিচু পানেনকা শট অনায়াসের মুঠোয় জমান তিনি। ওখানেই নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ।
অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হতেই জমে ওঠে ফুটবল। ৯৪তম মিনিটে ইদ্রিসা গেয়ির থ্রু বল ধরে, ডি-বক্সে ঢুকেই বুলেট গতির কোনাকুনি শটে দলকে এগিয়ে নেন পাপ গেয়ি। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সমতায় ফেরার সুবর্ন সুযোগ পায় মরক্কো; কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি। নায়েফের হেড বাধা পায় ক্রসবারে।
তিন মিনিট পরই সব অনিশ্চয়তার ইতি টেনে দিতে পারতেন বদলি নামা ফরোয়ার্ড শেরিফ এনজাইয়ে। কিন্তু তার প্রথম শট এগিয়ে এসে রুখে দেন বোনো, এরপরও সুযোগ ছিল; কিন্তু আলগা বল লক্ষ্যভ্রষ্ট শট করেন এনজাইয়ে। ওই হতাশায় যদিও ম্যাচ শেষে পুড়তে হয়নি তাকে বা তার দলকে।
তবে শিরোপা লড়াই ঘিরে রাবাতের সবুজ আঙিনায় যত আপত্তিকর, অসুন্দর, বিতর্কিত ঘটনা ঘটল, তাতে ফুটবলের সৌন্দর্য নিশ্চিতভাবেই নষ্ট হলো।
খেলার মাঝে কোচের ডাকে সেনেগাল দলের ড্রেসিং রুমে চলে যাওয়ার পর ধারাভাষ্যকর যেমন বলছিলেন, এখানে হেরে গেল আফ্রিকার ফুটবল!
এমআর/টিএ