তেহরানে নজিরবিহীন বিক্ষোভ চলার প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল মনে হলেও, কেবল বাহ্যিক সামরিক আঘাতে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে-এমন ধারণা বাস্তব সম্মত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠা সংহতিই এই শাসনব্যবস্থার প্রধান শক্তি, যা তাকে গভীর বৈধতা সংকটের মধ্যেও টিকিয়ে রাখছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণ।
ইরান কোনো একক ক্ষমতাকেন্দ্রনির্ভর রাষ্ট্র নয়। এটি একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক ও হেটেরার্কিক্যাল কাঠামো, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর, বিপ্লবী গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, ধর্মীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ডিক্যাপিটেশন কৌশল ‘Decapitation’ প্রয়োগ করলেও পুরো ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে নব্য-রক্ষণশীল মহলের চাপের মুখে শক্তি প্রয়োগের কথা বিবেচনা করলেও, অন্যদিকে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকরা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘ সামরিক অভিযানের বিরোধী। এর ফলে ওয়াশিংটনের নীতিতে দেখা যাচ্ছে সীমিত, দ্রুত ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের প্রবণতা -যা দৃঢ় বার্তা দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি দায় এড়ায়।
আঞ্চলিক রাজনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্পগুলো সীমিত করে রেখেছে। ইসরায়েল চায় ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক ভূমিকা নিক, তবে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানসহ উপসাগরীয় অংশীদাররা উত্তেজনা হ্রাস ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় ঘাঁটি ও আকাশপথ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে, যুক্তরাষ্ট্রকে দূরবর্তী স্থান থেকে পরিচালিত সামরিক বিকল্পের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের প্রকৃত লক্ষ্য ইরানে উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়। বরং একটি বাস্তববাদী ইরান, যাকে আঞ্চলিক ভূ-অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত করা যাবে এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে কিছুটা সরিয়ে আনা যাবে এটাই মূল উদ্দেশ্য। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন হ্রাস।
সামরিক বিমানশক্তি নির্দিষ্ট স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে ও চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও, এটি নিরাপত্তা খাত পুনর্গঠন, উত্তরাধিকার নির্ধারণ বা দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না। ২০১১ সালের লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিমান হামলা শাসন পতনের পর স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হতে পারে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য সামরিক দৃশ্যপট হিসেবে সীমিত দূরপাল্লার শাস্তিমূলক হামলার কথা বলা হচ্ছে, যা বিপ্লবী গার্ডের কিছু অবকাঠামো লক্ষ্য করতে পারে। তবে এতে গার্ডদের হাতে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’র বয়ান শক্তিশালী হবে, অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের উপসংহার-ইরানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ শাসনব্যবস্থা ভাঙার চেয়ে বরং অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার করতে পারে। ফলে কূটনীতি ও সীমিত চাপই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাইবার ও ইলেকট্রনিক ব্যাঘাতকে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে একটি পৃথক শ্রেণীর চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে -যার দৃশ্যমানতা কম, অনেক ক্ষেত্রে অস্বীকারযোগ্য, এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রকাশ্য যুদ্ধে না জড়ানোর প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব অনিশ্চিত ও প্রায়ই সাময়িক; একটি নেটওয়ার্কযুক্ত রাষ্ট্র সময়ের সঙ্গে এসব ব্যাঘাত এড়িয়ে যেতে সক্ষম।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাইবার অপারেশনগুলো অন্যান্য কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের সঙ্গে সমন্বয়ে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু একা-একা তা নির্ধারণমূলক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে না। বিশেষ করে, বাইরের চাপ প্রায়শই ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত অভ্যন্তরীণ ফলাফল -শীর্ষ নেতৃত্বে বাস্তবসম্মত পরিবর্তন -ঘটাতে ব্যর্থ হয়।
কঠোর বহিরাগত চাপ অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণমূলক কোরকে আরও দৃঢ় করে, যেখানে বাড়তি সহিংসতা আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বেশি করে নিরাপত্তাজনিত আতঙ্কের প্রতিফলন। টেকসই পরিবর্তনের একমাত্র উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ গতিবিধিকে -নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ফাটল বা অভিজাত শ্রেণির বিভাজন, যা প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃত্বকেন্দ্র তৈরি করে।
এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুপারিশ হিসেবে বলা হয়েছে, নাটকীয় সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে সংহতি-গঠনমূলক কৌশলে মনোযোগ দেওয়া উচিত। বৃহৎ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বজায় রাখার পাশাপাশি এমন প্রতিশ্রুতি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা যুদ্ধ ছাড়া বাস্তবায়নযোগ্য নয়। অর্থনৈতিক চাপ লক্ষ্যভিত্তিক করে সহিংসতার জন্য দায়ীদের ওপর আরোপ করার কথা বলা হয়েছে, একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা ও উদারীকরণের পক্ষে থাকা প্রযুক্তিবিদ ও বাস্তববাদীদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য ‘বাইরে যাওয়ার পথ’ খোলা রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় -বিশেষত কাতার, ওমান ও সৌদি আরবের সঙ্গে -উত্তেজনা কমাতে এবং জবরদস্তিমূলক কথোপকথনকে কার্যকর বাণিজ্যিক পরিসরে রূপান্তরে সহায়ক হতে পারে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমন করতে সক্ষম হলেও, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দানাবাঁধা ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
পিএ/টিকে