মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একের পর এক পরিবর্তন দেখা যায়। লাগামহীন শুল্কারোপ, নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতা কিংবা নতুন করে যুদ্ধের সূচনা- গত এক বছরে এর সবই দেখেছে বিশ্ববাসী। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমগুলোতেও তার এসব সিদ্ধান্তের বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা দেখা গেছে।
ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্ত যেমন ইতিবাচক ফলাফল এনেছে, বিপরীতে নেতিবাচক সিদ্ধান্তের তালিকাও ছোট নয়। তবে ২০২৫ সালে ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অন্যতম সফলতার নিদর্শন গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
কাগজে কলমে হলেও ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বর্বরতা বন্ধে সাফল্যের ছাপ রেখেছেন ট্রাম্প। চুক্তির আওতায় বন্দি বিনিময় ও ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। তবে ট্রাম্পের গাজা ‘নিয়ন্ত্রণে নেয়া’ সংক্রান্ত বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দেয়।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবাসনে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধেও সোচ্চার দেখা যায় তাকে। নিজেকে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেন ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে একাধিক ফোনালাপ ও আলাস্কায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলেও তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনায় ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার ইঙ্গিত আছে বলে জানা যায়। তবে এখনও পরিকল্পনার সব শর্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
ট্রাম্পের দাবি, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতসহ বিশ্বের আটটি যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছেন তিনি। এর জন্য তার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্য মনে করেন তিনি। পুরস্কার পাবেন এমনটাও আশা করছিলেন। যুদ্ধ থামানো নিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে গর্ব করলেও ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অপহরণ করার পর সমালোচনার মুখোমুখি হন ট্রাম্প।
ভেনেজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতার কথা জানালেও দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প পুনর্গঠনে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি নিজেকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। বলেন রাষ্ট্রের সংস্কারের কথাও। তবে এর বাস্তবায়ন কিভাবে হবে তার কোনো যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এখনও মুখ খোলেননি তিনি।
গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ক্ষমতার এক বছর পূরণ করেন ট্রাম্প। দিনটি রীতিমতো গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে উদযাপন করেন তিনি। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে বারবার উল্লেখ করে আসছেন।
রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতির আশঙ্কা তুলে ধরে ডেনমার্কের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। কখনও সরাসরি মালিকানা নেয়ার, কখনও নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের স্বশাসন, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং ন্যাটোর কাঠামো বিবেচনায় এই পরিকল্পনা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে ইউরোপে প্রশ্ন ওঠে।
ইরানের ক্ষেত্রে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিতে ফিরে সামরিক হামলার দাবি করা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্পষ্ট নয়। পরমাণু ইস্যুতে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যে গত বছরের জুনে ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালিয়েও তেমন সাফল্য অর্জন পাননি ট্রাম্প। প্রায় ছয় মাস পর চলতি মাসের প্রথম দিকে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের মধ্যে দেশটিতে সরকার বদলের ডাক দিয়েও কার্যত ব্যর্থ তিনি।
চীনের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে একদিকে চাপ, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে আংশিক ছাড়, দুই পথেই এগোতে দেখা যায় তাকে। নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টানদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগে সামরিক হামলার ঘোষণা মানবাধিকার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের ওপর যৌক্তিক হিসাব ছাড়াই লাগামহীন শুল্কারোপও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে বিতর্কিত করে তুলেছে।
এমআই/এসএন