রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেছেন, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট আস্থার প্রশ্ন তত স্পষ্ট হয়ে সামনে আসছে।
কাগজে-কলমে নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তির সংযুক্তি কিংবা প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের চেষ্টা সবই প্রশংসনীয় হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে পোস্টাল ব্যালট ঘিরে শুরুতেই যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আবারও দেখিয়ে দিল সমস্যা কেবল প্রক্রিয়ায় নয়, বরং প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সন্দেহই এ দেশের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ফ্যাক্টর। নির্বাচন হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান ন্যায্যতা।
আপনি যদি এমনভাবে প্রক্রিয়া ডিজাইন করেন, যাতে একটি ভিডিওই পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলতে পারে, তাহলে আপনি নিজেই নিজের অর্জন ভেঙে ফেলার ঝুঁকি নেন।
সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলের এক ভিডিওতে জিল্লুর রহমান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এবার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত পোস্টাল ভোটারের সংখ্যা ১৫ লক্ষেরও বেশি। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারি নিবন্ধন শেষ হওয়ার পর মোট নিবন্ধন ১৫.৩৩ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রবাসী নিবন্ধনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশে এই প্রথম প্রবাসী ভোট বাস্তব অর্থে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলো।
যদিও মোট ভোটারের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় এক শতাংশের কাছাকাছি, তবু বাস্তবতা হলো কিছু আসনে ১০ থেকে ১৫ হাজার পোস্টাল ভোটই ফলাফলের মার্জিন উল্টে দিতে পারে, বিশেষ করে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘনিষ্ঠ।
ফলে পোস্টাল ব্যালট এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নয়; এটি সরাসরি ফল নির্ধারণের সম্ভাব্য হাতল। রাজনৈতিকভাবে এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তিনি আরো বলেন, এই প্রেক্ষাপটে বাহরাইনের একটি বাসায় অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট একসঙ্গে গোনা হচ্ছে। এমন ভিডিও ভাইরাল হওয়া স্বাভাবিকভাবেই ভয় বাড়িয়েছে। সরকার বলছে তদন্ত হবে এবং বাহরাইনের কর্তৃপক্ষের রিপোর্টেও ঘটনাটি নিশ্চিত হয়েছে।
নির্বাচন হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান বৈধতা। আপনি যদি এমনভাবে প্রক্রিয়া ডিজাইন করেন, যাতে একটি ভিডিওই পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলতে পারে, তাহলে আপনি নিজেই নিজের অর্জন ভেঙে ফেলার ঝুঁকি নেন। অন্যদিকে বিএনপির আপত্তি কেবল ওই ভিডিও ঘিরে নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার নকশা নিয়েই। দলটির অভিযোগ বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক ও নাম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে বিএনপির প্রতীক মাঝামাঝি পড়ে যাচ্ছে, ফলে ভাঁজ হলে তা স্পষ্ট দেখা নাও যেতে পারে। তারা এটিকে বায়াস হিসেবে দেখছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, প্রতীকগুলো বর্ণানুক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মানদণ্ড শুধু ‘রুল ফলো’ করা নয়। মানদণ্ড হলো রুলটি কি ন্যায্য এবং ন্যায্য বলে মনে হয়? ব্যালট পেপারের ডিজাইন এমন একটি জায়গা, যেখানে বাস্তবে এর গুরুত্ব অনেক সময় ফলাফলের সমান হয়ে ওঠে। কারণ ভোটার, রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষক সবার বিশ্বাসের শুরুটা চোখে দেখা থেকেই। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, কাস্টডির প্রশ্ন কার হাতে ব্যালট গেল, কে পেল, কীভাবে পেল, কীভাবে ফেরত এলো এই পুরো চেইন কি যাচাইযোগ্য ও স্বচ্ছ? দ্বিতীয়ত, ন্যায্যতার প্রশ্ন একই নিয়মে ছাপা হলেও সেটি কি সবার জন্য সমানভাবে সুবিধাজনক? প্রবাসী ভোটে পোস্ট অফিস, দূতাবাস, স্থানীয় ডেলিভারি ব্যবস্থা সব মিলিয়ে ঝুঁকি বহু স্তরে। তাই দোষ কার সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে কমিশনের দায়িত্ব হওয়া উচিত ঝুঁকিগুলোকে প্রকাশ্যে, পরিমাপযোগ্যভাবে তুলে ধরা, যাতে কেউ অন্ধকারে কল্পনার সুযোগ না পায়।
তিনি আরো বলেন, এই পোস্টাল ব্যালট বিতর্কের পাশেই আরেকটি বড় স্রোত পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে আরো জটিল করে তুলছে। একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের সক্রিয় প্রচারণা। সরকারি ফটোকার্ড প্রকাশ, প্রচারণার ভাষা, এমনকি ব্যাংকগুলোকে শাখা পর্যায়ে ব্যানার টানিয়ে নির্দিষ্ট অবস্থানের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশ এসব খবর প্রকাশ্যে এসেছে।
তিনি বলেন, একদিকে বলা হচ্ছে নির্বাচন হবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে, আর অন্যদিকে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানের পক্ষে দৃশ্যমান হতে বলা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিকভাবে ভয়াবহ বার্তা দেয়। কারণ মাঠের বাস্তবতায় ডিসি, ইউএনও, রিটার্নিং অফিসার, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা সবাই কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী মেশিনারির অংশ। এই অংশ যদি প্রকাশ্যে এক পক্ষে কথা বলে, তাহলে ভোটারের মনে প্রশ্ন জাগে নিরপেক্ষ থাকবে কে?
তিনি আরো বলেন, এই আস্থা সংকট আরো গভীর হয় যখন একই সময়ে সুশাসন, সংস্কার ও আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য নিয়ে টিআইবির মতো সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের ভাষায়, অধ্যাদেশ প্রণয়নে অংশীজনের সম্পৃক্ততা কম, কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের বদলে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের শক্তিশালী অংশ সংস্কারের গতি নির্ধারণ করছে। ভোটার এগুলো আলাদা করে দেখে না। ভোটার দেখে একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় আচরণ। রাষ্ট্র কি সত্যিই নিরপেক্ষতার দিকে যাচ্ছে, নাকি নতুন ব্যানার লাগিয়ে পুরনো অভ্যাসকে আধুনিক ভাষায় চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটও চাপ বাড়াচ্ছে। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, বাংলাদেশে হামলাগুলোকে ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ এসব কেবল বিবৃতি নয়। এগুলো নির্বাচনী সময়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগের ইঙ্গিত। আর আন্তর্জাতিক মনোযোগ মানেই শুধু ইমেজ নয়; এটি নির্বাচন-পরবর্তী স্বীকৃতি, কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক বার্তার সঙ্গেও যুক্ত।
তিনি বলেন, এ ব্যাপারে করণীয় হতে পারে - প্রথমত, পোস্টাল ব্যালটকে কোনো পক্ষের সন্দেহের উপহার বানানো যাবে না। নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে পোস্টাল ভোটের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, জনসমক্ষে ব্যাখ্যাযোগ্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) প্রকাশ করতে হবে প্রিন্টিং, প্যাকিং, প্রেরণ, ডেলিভারি, রিটার্ন ও গ্রহণ প্রতিটি ধাপে কোথায় কী ঝুঁকি রয়েছে, তা স্পষ্ট করে। দ্বিতীয়ত, ব্যালট ডিজাইন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো “আইন মেনেই করেছি” বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। ডিজাইন ফেয়ারনেসের ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো প্রতীক ভাঁজে হারিয়ে না যায়, কোনো কলাম বা বিন্যাস কৌশলগত মনে না হয়। তৃতীয়ত, সরকার যদি সত্যিই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ রাখতে চায়, তাহলে গণভোটের প্রচারণায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
তিনি আরো বলেন, কারণ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জিতবে বা হারবে শুধু দল নয় জিতবে বা হারবে বিশ্বাস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি হলো, আমরা প্রায়ই ফলাফল নিয়ে তর্ক করি, কিন্তু প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করার শর্তগুলো নিয়ে একমত হতে পারি না।
তিনি বলেন, পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক আমাদের সামনে একটি নির্মম সুযোগ এনে দিয়েছে নির্বাচন শুরুর আগেই যে জায়গাগুলো ভেঙে পড়তে পারে, সেগুলো মেরামত করার সুযোগ। নইলে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের রাতে দেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আবারও একই থাকবে ভোটের ছবি দেখা গেল, কিন্তু ভোটটা কি সত্যিই হলো?
এসএস/এসএন