চোখ দিয়ে মানুষের মন পড়ার কোরিয়ান জাদুর নাম হলো ‘নুনচি’। যার আক্ষরিক অর্থ হলো চোখের মাপ। নুনচি মানে কেবল কারো কথা শোনা নয়, বরং পরিস্থিতি, মানুষের অনুভূতি এবং পরিবেশের প্রতিটি সূক্ষ্ম সংকেত বুঝে নেওয়া। কোরিয়াতে শিশুদের মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই এই দক্ষতা শেখানো হয়। এটি মানুষকে সমাজে খাপ খাওয়াতে এবং সম্পর্ক মজবুত রাখতে সাহায্য করে।
নুনচি অতিপ্রাকৃত কোনো ক্ষমতা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মন পড়ার কৌশল। কোরিয়ার অভিভাবকরা শিশুকে বলে, ‘তোমার কোনো নুনচি নেই কেন?’ এর মানে হলো পরিবেশ অনুযায়ী আচরণ করতে শেখ। নুনচি শেখা মানে নিজের পুরোনো ধারণা ঝেড়ে ফেলা, চোখ এবং অঙ্গভঙ্গি পড়ে মানুষের আসল মন বোঝা। যারা লাজুক বা অন্তর্মুখী, তাদের জন্য এটি বিশেষ দক্ষতা।
কোরিয়ান-আমেরিকান সাংবাদিক ইউনি হং তার বই ‘দ্য পাওয়ার অফ নুনচি’তে দেখিয়েছেন কিভাবে নুনচি ব্যবহার করে মানুষ সুখী ও পেশাগতভাবে সফল হতে পারে। পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন কোরীয় জীবনদর্শন নুনচিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এই বই। লেখক ইউনি হং এই বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে কেবল পরিস্থিতির গভীর পর্যবেক্ষণ বা নুনচি ব্যবহার করে একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত সুখ এবং পেশাগত সাফল্য নিশ্চিত করতে পারে। ইউনি হং বলেন, এটি শুধু মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং সবার জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরির বিজ্ঞান।
উদাহরণ হিসেবে হং একটি নারীর গল্প উল্লেখ করেছেন, যিনি কেবল নিরবতা অবলম্বন করে, চুপচাপ বসের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করেছিলেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক মিরাকলেও নুনচি বড় ভূমিকা রেখেছে। মাত্র ৭০ বছর আগে কোরিয়া যুদ্ধের পর বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের মধ্যে ছিল। প্রাকৃতিক সম্পদ কম, অর্থনীতি ক্ষীণ, কিন্তু নুনচি ব্যবহার করে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের পরিকল্পনা বদলাতে শিখেছে দেশটির মানুষেরা। অন্য জাতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রয়োজনগুলো বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের পরিকল্পনা বদলে ফেলার ক্ষমতা বা ‘দ্রুত নুনচি’ তাদের সফল করেছে। আজ দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ।
নুনচি চর্চার মূল কথা হলো সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও ধৈর্য। আলোচনা, অফিস বা দৈনন্দিন জীবনে এটি মানুষের সামাজিক উদ্বেগ কমায়। যে ব্যক্তি নীরব থেকেও পরিস্থিতি বোঝে, তার সুবিধা অন্যদের তুলনায় বেশি। চোখ, অঙ্গভঙ্গি, কথার অন্তর্নিহিত অর্থ- সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে নুনচি কার্যকর হয়।
এমকে/এসএন