গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল দিলে বৈষম্য দূর হবে-এ দাবি বিভ্রান্তিকর ও অসৎ: আসিফ সালেহ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল দিলে বাংলাদেশ বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নমুক্ত হবে—ড. ইউনূসের এমন বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তিকর ও অসৎ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। আজ মঙ্গলবার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ওই পোস্টে আসিফ সালেহ বলেন, ‘আপনি কি জানেন এই গণভোটে আপনি কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার জন্যও ভোট দিচ্ছেন? আমি জানতাম না। শুধু আমি না। বাড়ির বুয়া থেকে ব্যারিস্টার বন্ধু পর্যন্ত সবাই কনফিউসড এই গণভোট নিয়ে! কারণটা কি?’

গণভোটে ‘চালাকি’ করা হচ্ছে অভিযোগ তুলে আসিফ বলেন, ‘ভোটের দিন আলাদা ব্যালটে ভোটাররা যে গণভোটে ভোট দিবেন সেখানে সুনির্দিষ্ট করে খুব অল্প করে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। এই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন আছে কি না, সেই প্রশ্নে ‘‘হ্যাঁ’’ অথবা ‘‘না’’ ভোট দিবেন ভোটাররা। কিন্তু এই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একটু চালাকি!? এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবনা সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথাও জানিয়েছে সরকার।

‘একটি ‘‘হ্যাঁ’’ ভোটের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন অনুমোদনের কথা বলা হচ্ছে—নির্বাচনকালীন শাসনব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো, ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক ৩০ দফা অঙ্গীকার এবং একটি নতুন উচ্চকক্ষ (Upper Chamber) গঠনের মতো গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত।

‘এই সবকিছুকে একত্রে একটি প্রশ্নে বেঁধে দেওয়া মানে ভোটারদের প্রকৃত পছন্দের সুযোগ কেড়ে নেওয়া। কেউ হয়তো নির্বাচন কমিশন সংস্কারের পক্ষে, কিন্তু উচ্চকক্ষের বিপক্ষে। কেউ হয়তো কিছু দফায় একমত, অন্য দফায় নয়। কিন্তু এই গণভোটে সেই ভিন্নমত জানানোর কোনো সুযোগ নেই।’

গণভোট নিয়ে ড. ইউনূসের বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও অসৎ দাবি করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এর ওপর আবার ভোটারদের বলা হচ্ছে—‘‘হ্যাঁ’’ ভোট দিলেই পরিবর্তন আসবে। কয়েকদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ নিয়ে রেডিও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য একটি ভিডিও বার্তাও দেন। যেখানে ‘‘হ্যাঁ’’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘‘হ্যাঁ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।’’ এটি একটি বিভ্রান্তিকর এবং অসৎ দাবি। কোনো একটি গণভোট নিজে থেকেই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না। পরিবর্তন আসে রাজনৈতিক আচরণ, দলীয় সংস্কার, জবাবদিহি এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে। একটি হ্যাঁ ভোটকে পরিবর্তনের একমাত্র শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা মানে মিথ্যা আশা দিয়ে বোঝাপড়া চাপিয়ে দেওয়া।’

গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘এই গণভোটের মাধ্যমে ভোটারদের বলা হচ্ছে কী কী সংবিধানে যুক্ত হবে, কিন্তু বলা হচ্ছে না—এর খরচ কত হবে, বাস্তবে এটি কীভাবে কাজ করবে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো আদৌ সমাধান করবে কি না। এগুলোর অনেকগুলোতে আমার আপত্তি না থাকলেও আমার আপত্তি এর প্রক্রিয়াতে এবং এর অস্বচ্ছতায় আর তাড়াহুড়োতে।’

গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভোটারদের বোধগম্যতা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন আসিফ সালেহ। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যদি ভোটাররা না বোঝে, আর তবুও তাদের সম্মতি আদায় করা হয়—তাহলে তা সম্মতি নয়, তা কেবল প্রক্রিয়াগত অনুমোদন। এই কারণে এই গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরিবর্তনের বিরোধিতা নয়। এটি হলো বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়ানো প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করা।

‘গণভোটের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও এর মধ্যে কোন কোনটিতে বিএনপি, কোনটিতে জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। প্রথমে প্রস্তাবনা ছিল যে, যেসব প্রশ্নে যে রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে সেই দল ক্ষমতায় গেলে ওই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে না।

‘তবে, শেষ পর্যন্ত এই নিয়ে সমাধানে ব্যর্থ হয়ে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’ জয় পেলে আগামী সংসদে এই ৮৪টা ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। এখানেও একটা নির্বাচন পরবর্তী ভুল বোঝাবুঝির জায়গা তৈরি হয়েছে। আর যদি ‘‘না’’ ভোট জয় পায় তাহলে জুলাই সনদই কার্যকর হবে না।’

এবি/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে গাজীপুরের মানুষের বিরাট ভূমিকা রয়েছে: তারেক রহমান Jan 28, 2026
img
ভারত বললে ঠিকই বিকল্প ভেন্যু দিতো আইসিসি, বিশ্বকাপ নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিক Jan 28, 2026
img
চায়ের আড্ডা থেকে ফাহমিদা নবী ও জয়ের নতুন গান Jan 28, 2026
img
ফুটবলে সিন্ডিকেট থাকলে অবশ্যই ভেঙে ফেলা হবে: আমিনুল হক Jan 28, 2026
img
ভোটের মাধ্যমেই ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব: হাবিব Jan 28, 2026
img
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলেই কড়াইল বস্তির সমস্যা দূর হবে: আবদুস সালাম Jan 28, 2026
img
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২২ জন বিএনপি নেতাকর্মীর জামায়াতে যোগদান Jan 28, 2026
img
যে কোনো ঘটনায় তারেক রহমানের নাম জড়ানো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির প্রতিফলন: মাহদী আমিন Jan 28, 2026
img
‘হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল’, অরিজিতের প্লে-ব্যাক বিদায়ে স্তম্ভিত লগ্নজিতা Jan 28, 2026
img

গোপালগঞ্জে পথসভায়

৫৬ হাজার বর্গমাইল জায়গার উপরে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করব: জামায়াত আমির Jan 28, 2026
img
‘নিশ্চয়ই ও কিছু খোঁজার চেষ্টা করছে, কিন্তু পাচ্ছে না!’ অরিজিতের ঘোষণায় জিতের প্রতিক্রিয়া Jan 28, 2026
img
লুট হওয়া অস্ত্র জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তার করলেই পাওয়া যাবে: হারুনুর রশীদ Jan 28, 2026
img
আমি নির্বাচিত হলে চান্দাবাজি চলবে না, চান্দাবাজদের কাজ দেব: নুরুল ইসলাম Jan 27, 2026
img
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল দিলে বৈষম্য দূর হবে-এ দাবি বিভ্রান্তিকর ও অসৎ: আসিফ সালেহ Jan 27, 2026
img
ব্রুকের বিধ্বংসী সেঞ্চুরিতে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সিরিজ জিতল ইংল্যান্ড Jan 27, 2026
img
মেসির চেয়ে রোনালদোকে এগিয়ে রাখলেন ডি মারিয়া Jan 27, 2026
img
দলীয় সব পদ থেকে আরো ৪ নেতাকে বহিষ্কার করল বিএনপি Jan 27, 2026
img
দুর্নীতি আমার পরিবারের কেউ করলেও তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেন: শামা ওবায়েদ Jan 27, 2026
img
জামায়াতের সঙ্গে আসলে আওয়ামী লীগ নেতাদেরও সাতখুন মাফ: রিজভী Jan 27, 2026
img
বউভাতের দুপুরে স্নিগ্ধ সাজে মধুমিতা ও দেবমাল্য Jan 27, 2026