রাজধানীর একটি নির্বাচনী জনসভায় বিগত ১৫ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের আর্তনাদ এবং দলের শীর্ষ নেতাদের শাহাদাতের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) মিরপুরে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমানের সমর্থনে আয়োজিত জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান যখন গুম হওয়া সন্তানদের মা এবং পিতৃহীন শিশুদের করুণ আকুতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে এবং তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি আজকে এখানে দাঁড়িয়েছি সেই সমস্ত মায়েদের কথা বলতে, সেই সমস্ত পিতাদের কথা বলতে, সেই সমস্ত শিশুদের কথা বলতে, গত সাড়ে ১৫টি বছর যাদের চোখের কোণায় আমি পানি দেখিনি, আমি রক্ত দেখেছি।’ তিনি উল্লেখ করেন, এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, শিশুরা হারিয়েছে তাদের পিতাকে।
গুম থাকার সময়ে ব্যারিস্টার আরমানের পরিবারের করুণ পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমি যখন আরমানের মায়ের কাছে ফোন করতাম, তিনি ধরা গলায় জিজ্ঞেস করতেন, আমার আরমানের কোনো খবর আছে? সে কি বেঁচে আছে।’
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আরমানের অবুঝ দুই শিশু যখনই ফোনে রিং হতে শুনত, তারা দৌড়ে এসে বলত, ‘দাদু, এটা কি আব্বুর ফোন? যদি আব্বুর ফোন হয় আমাদেরকে একটু কথা বলতে দাও।’ এই স্মৃতিচারণ করার সময় ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং উপস্থিত জনতাকেও অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়।
শহীদ মীর কাসেম আলীর ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আরমান যেমন ইউনিক, তার পিতাও তেমন ইউনিক ছিলেন। তিনি এদেশের যুবসমাজের ভাগ্য বদলানোর কারিগর ছিলেন।’
তিনি জানান, মীর কাসেম আলী যখন বিদেশে ছিলেন, তখন তাকে দেশে ফিরতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নেতারা যদি জুলুম সহ্য করতে পারেন, আমি মীর কাসেম আলীও পারব। আমি প্রমাণ করব আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা।’
হকের ওপর দাঁড়িয়ে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তার এই ফিরে আসাকে ডা. শফিকুর রহমান এক অনন্য আত্মত্যাগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
জামায়াতের ১১ জন শীর্ষ নেতার ফাঁসির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের একমাত্র অপরাধ ছিল তারা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলেন। বিচারের নামে চরম অবিচার করে তাদের খুন করা হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, ফাঁসির তক্তার সামনে দাঁড়িয়েও তারা কাঁদেননি, বরং 'জান্নাতি হাসি' মুখে নিয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান জুলাই বিপ্লবের শহীদ আবু সাঈদ, আবরার ফাহাদ এবং হাদির কথা স্মরণ করেন। তিনি তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে বলেন, ‘তোমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা লড়ে যাব। দুনিয়ার মাটিতে তোমাদের বিচার নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।’
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, তিনি কেবল জামায়াতের বিজয় নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের মুক্তি এবং একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে 'দাঁড়িপাল্লা' প্রতীকের বিজয় চান। সভা শেষে তিনি গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরে আসা এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া করেন।
টিজে/টিকে