আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (আফকন) ফাইনালে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় আফ্রিকান ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (সিএএফ) এক মিলিয়ন ডলারেরও বেশি জরিমানা আরোপ করেছে এবং সেনেগালের কোচসহ সেনেগাল ও মরক্কোর একাধিক খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ করেছে। ওই ফাইনালে প্রতিবাদ করে সেনেগাল দলের মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া, দর্শকদের মাঠে ঢোকার চেষ্টা এবং সাংবাদিকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ঘোষিত এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল আফ্রিকান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। সিএএফ জানিয়েছে, জুনে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। সেনেগাল ও মরক্কো উভয়ই জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
সিএএফ ঘোষিত শাস্তির মধ্যে রয়েছে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকদের অসদাচরণসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনকে মোট ৬ লাখ ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা) এবং রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশনকে ৩ লাখ ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা) জরিমানা।
গত ১৮ জানুয়ারির আফকন ফাইনালে, ম্যাচের শেষ দিকে স্বাগতিক মরক্কোর পক্ষে একটি পেনাল্টি দেওয়ার প্রতিবাদে সেনেগালের খেলোয়াড়রা কোচ পাপে থিয়াওয়ের নেতৃত্বে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। আফ্রিকান কনফেডারেশন জানায়, খেলাটিকে ‘অমর্যাদা’ করার দায়ে থিয়াওকে পাঁচ ম্যাচের জন্য আফ্রিকান প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ১ লাখ ডলার (১ কোটি ২২ লাখ টাকা) জরিমানা করা হয়েছে। গত সপ্তাহেই তিনি তার দলের ওই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন।
প্রায় ১৫ মিনিট বিলম্বের পর ম্যাচ আবার শুরু হয়। মরক্কো পেনাল্টি মিস করে এবং অতিরিক্ত সময়ে সেনেগাল ১-০ ব্যবধানে জিতে আফ্রিকান শিরোপা ধরে রাখে।
রাবাতে অনুষ্ঠিত উত্তপ্ত এই ফাইনালে সমর্থকদের মাঠে ঢোকার চেষ্টা, মরক্কো ও সেনেগালের খেলোয়াড়দের সাইডলাইনে ধাক্কাধাক্কি, দুই দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে মিডিয়া এলাকায় মারামারি এবং একটি অদ্ভুত ঘটনা, যেখানে মরক্কোর বল বয়রা সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডির ব্যবহৃত একটি তোয়ালে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে-যা তাকে বিভ্রান্ত করে স্বাগতিকদের জয়ের সুযোগ তৈরির প্রচেষ্টা বলে মনে করা হয়।
স্বাগতিক দলের বল বয়দের এই আচরণের কারণে মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশনকে ২ লাখ ডলার (প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা) জরিমানা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মরক্কো ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক (স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে) এবং এই বিশৃঙ্খল ফাইনালের কারণে দেশটি বাড়তি নজরদারির মুখে পড়েছে।
২০২৮ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার হাসান দ্বিতীয় স্টেডিয়ামে (বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম হতে যাচ্ছে) মরক্কো ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের আশা করছিল। কিন্তু এই মাসের আফ্রিকান ফাইনাল তাদের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই বলেন, এই ম্যাচ আফ্রিকান ফুটবলের 'লজ্জাজনক' চিত্র উপস্থাপন করেছে।
শাস্তির অংশ হিসেবে সেনেগালের ইলিমান এনদিয়ায়ে ও ইসমাইলা সারকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মরক্কোর আছরাফ হাকিমিকেও এক ম্যাচের স্থগিতসহ দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মরক্কোর ইসমাইল সাইবারিকে তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তার ওপর ১ লাখ ডলার জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে।
এই ম্যাচ ঘিরে সেনেগাল ও মরক্কোর কূটনৈতিক সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি হয়। দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তারা শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং বন্ধুত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। মরক্কোতে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দেশটিতে বসবাসকারী সাব-সাহারান আফ্রিকানদের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণাত্মক বক্তব্য’ ছড়ানোর অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
সেনেগালের প্রধানমন্ত্রী ওসমান সনকো ম্যাচের কয়েক দিন পর মরক্কো সফরে গিয়ে বলেন, এই প্রতিক্রিয়াগুলোকে ‘উচ্ছ্বাস থেকে জন্ম নেওয়া আবেগী বিস্ফোরণ’ হিসেবে দেখা উচিত, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিভাজন হিসেবে নয়।
মরক্কোর ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপ স্বপ্নে আরেকটি ধাক্কা আসে, যখন স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ঘোষণা দেন যে ফাইনাল ম্যাচটি তাদের দেশেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা ফিফার হাতে, যারা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি টুর্নামেন্টের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি কোথায় অনুষ্ঠিত হবে।
আরআই/টিকে