নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কঠোর নজরদারি

ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেষ্টনী বা চেকপোষ্ট ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গারা বাইরে আসার প্রবনতা রোধ করতে না পারায় আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সংঘাতে সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিপথগামী রোহিঙ্গাদের নির্বাচনে ব্যবহারের চেষ্টা। এ অবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে আসা ঠেকানোর দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প; আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য দেয়া হয়েছিল কাঁটাতারের বেষ্টনী। কিন্তু এসব বেষ্টনীর বেহাল অবস্থা। অনেক স্থানে কাঁটাতারের চিহ্নও নেই। যার কারণে রোহিঙ্গারা অবাধে লোকালয়ে যাতায়াত করছে। আর ক্যাম্পে যেসব সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব’ই নেই বললে চলে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অবাধে বের হচ্ছে রোহিঙ্গারা। জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতাদের দাবি-নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের ব্যবহারে শঙ্কা রয়েছে।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে রোহিঙ্গারা অবাধে ক্যাম্প এলাকা ত্যাগ করে বাইরে চলাচল করছে। ক্যাম্পের নির্ধারিত চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও তারা সহজেই বের হয়ে যাচ্ছে, যা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নির্বাচনী পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার যেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্পের মধ্যেই অবস্থান করে-সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও তদারকি জোরদার করে-এটাই আমাদের জোর দাবি।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ- নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেন স্থানীয় প্রবেশ করতে না পারে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গারাও যাতে ক্যাম্পে ছেড়ে বাইরে যেতে না পারে তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার।

এদিকে শঙ্কার বিষয়টি মাথায় রেখে কক্সবাজারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও কঠোর অবস্থানে। পুলিশ ও এপিবিএন বলছে, নির্বাচনকালীন সময়ে ক্যাম্প থেকে কোনো রোহিঙ্গাকেই লোকালয়ে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলব বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যে সমস্যাগুলো আমরা লক্ষ্য করছি, তা মোকাবিলায় ক্যাম্পগুলোকে এক ধরনের ‘সিলগালা’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিলগালা বলতে বোঝানো হচ্ছে-জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে, বিশেষ করে নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়ে ও নির্বাচনকালীন সময়ে, রোহিঙ্গারা যেন কোনোভাবেই ক্যাম্পের বাইরে বের হতে না পারে।

এ লক্ষ্যে এপিবিএনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ক্যাম্পের চারপাশে থাকা কাটাতারের বিভিন্ন স্থানে ফাঁক থাকায় সেসব পথ ব্যবহার করে কিছু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যাতে কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে বের হতে না পারে, সে বিষয়ে এপিবিএনকে বিশেষ ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, যেসব রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করছে বলে আমাদের ধারণা রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

অলক বিশ্বাস বলেন, এসব অভিযানের মাধ্যমে যারা বাসা ভাড়া দিয়ে বা অন্য কোথাও অবস্থান করছে, তাদের শনাক্ত করে পুনরায় ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো-নির্বাচনকালীন সময়ে কোনো দল বা গোষ্ঠী যেন রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের বিপজ্জনক বা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে না পারে।

উখিয়াস্থ ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, রাজনীতিবিদদের স্পষ্ট কমিটমেন্ট থাকতে হবে যে তারা কোনোভাবেই অন্য দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করবেন না। আমাদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে বের হয়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে। তারা এ দেশের নাগরিক বা ভোটার নয়, তাই রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের কোনো বৈধ সুযোগ তাদের নেই। এ বিষয়ে প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভ্যন্তরীণ টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম ইতোমধ্যে আরও জোরদার করা হয়েছে।

আর কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছেড়ে বাইরে গিয়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা অংশ নেয় তাদের কঠোর আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়েছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত এক মাস ধরে ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত আমাদের অফিসার ও ক্যাম্প ইনচার্জদের নিয়মিতভাবে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তারা রোহিঙ্গা কমিউনিটির মাঝি, ইমাম ও শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।

মো. মিজানুর রহমান আরও বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী-বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের যেকোনো ধরনের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। কোনো রোহিঙ্গা যদি নির্বাচনী প্রচারণা, মিছিল, সভা বা এ ধরনের কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই নির্দেশনা ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমরা আশা করছি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আমাদের দেওয়া নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মেনে চলবে।

বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা ১৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক।

এসকে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
মানুষ যেন নিরাপদে ভোট দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে : আসিফ মাহমুদ Jan 31, 2026
img
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে: আরিফুল ইসলাম Jan 31, 2026
img
৬ ফেব্রুয়ারি পুনর্মুক্তি পাচ্ছে ভানসালির কালজয়ী প্রেমকাব্য Jan 31, 2026
img
গ্যাসের সমস্যা সমাধানে কাজ করা হচ্ছে : ইশরাক Jan 31, 2026
img
আন্দোলনে লীগ পালিয়ে যায়, বিএনপি কখনো পালায় না : আব্দুস সালাম Jan 31, 2026
img
সীতা রামম-এর পর ফের একসঙ্গে দুলকার-মৃণাল Jan 31, 2026
img
বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মিশনে বাংলাদেশ Jan 31, 2026
img
মির্জা ফখরুলের হাতে ডিম ও জমানো সঞ্চয় তুলে দিলেন দুই ভোটার Jan 31, 2026
img
শেষ হলো ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা! Jan 31, 2026
img
একই দিনে ২ মুক্তি ঘিরে তোলপাড় টলিউডে Jan 31, 2026
রাশিয়াকে পরাজিত করার নতুন পরিকল্পনা ইউক্রেনের Jan 31, 2026
img
মিরপুর স্টেডিয়ামে গণমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত করল বিসিবি Jan 31, 2026
img
চট্টগ্রাম কারাগারে ক্যান্সার আক্রান্ত আ.লীগ নেতার মৃত্যু Jan 31, 2026
img
পুত্রসন্তানের বাবা হলেন অভিনেতা ইফতি! Jan 31, 2026
img
বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বিপদে ভারত Jan 31, 2026
img
এ আর রহমানকে নিয়ে মুখ খুললেন আমাল মালিক! Jan 31, 2026
img
পদত্যাগের ঘোষণা থেকে সরে এলেন ডাকসুর সর্বমিত্র Jan 31, 2026
img
ইরানের একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ Jan 31, 2026
img
আজ মুক্তি পেলে বক্স অফিসে ইতিহাস গড়তো অনুরাগ কাশ্যপের কাল্ট ক্লাসিক! Jan 31, 2026
img
স্লিভলেস হল্টার-নেক স্টাইল গোলাপি গাউনে নজর কাড়লেন জয়া আহসান! Jan 31, 2026