ওয়াশিংটনের সাথে ভিয়েতনামের কূটনৈতিক সম্পর্ক সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি "যুদ্ধবাজ" শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে সম্ভাব্য আমেরিকান "আগ্রাসন যুদ্ধের" জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভিয়েতনামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর নজরদারি করা সংস্থা 'দ্য ৮৮ প্রজেক্ট' এর বিশ্লেষণে উঠে আসা এই তথ্য ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক সরকারের ভেতরকার চিত্র তুলে ধরেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পন্ন "দ্বিতীয় মার্কিন আক্রমণ পরিকল্পনা" শীর্ষক মূল নথিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনকে প্রতিহত করার অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ভিয়েতনামের মতো দেশে অপ্রচলিত যুদ্ধ, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং এমনকি বৃহৎ আকারের আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত, বিশেষ করে যারা আমেরিকার রাজনৈতিক কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত।
ভিয়েতনামী পরিকল্পনাকারীদের মতে, যদিও বর্তমানে যুদ্ধের ঝুঁকি কম, তবুও আমেরিকার "যুদ্ধবাজ স্বভাব" সম্পর্কে তাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তারা আক্রমণের কোনো অজুহাত তৈরি করতে না পারে। নথিতে ২০০৪ সালের ইউক্রেনের অরেঞ্জ রেভোলিউশন বা ১৯৮৬ সালের ফিলিপাইনের ইয়েলো রেভোলিউশনের মতো "রঙিন বিপ্লব" এর মাধ্যমে কমিউনিস্ট সরকারকে উৎখাত করার মার্কিন প্রচেষ্টা নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ভিয়েতনামের সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ওবামা থেকে শুরু করে ট্রাম্প এবং বাইডেন প্রশাসন সকলেই এশীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে চীনের বিরুদ্ধে একটি ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করছে এবং ভিয়েতনামে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
দ্য ৮৮ প্রজেক্টের সহ-পরিচালক বেন সোয়ান্টন মন্তব্য করেছেন যে, এটি সরকারের কোনো বিচ্ছিন্ন অংশের মতামত নয়, বরং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় জুড়ে এই বিষয়ে একটি ঐকমত্য রয়েছে। তিনি বলেন, হ্যানয় ওয়াশিংটনকে কেবল কৌশলগত অংশীদার নয়, বরং একটি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবেই দেখে।
সিঙ্গাপুরের ISEAS-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের গবেষক নগুয়েন খাক গিয়াং-এর মতে, এই নথি ভিয়েতনামের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে উত্তেজনা প্রকাশ করে। একদিকে কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল ও সামরিক-সংযুক্ত গোষ্ঠী যারা আমেরিকার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান, অন্যদিকে যারা সম্পর্কের উন্নয়নে আগ্রহী। এই উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুনে, যখন একটি সামরিক টিভি প্রতিবেদনে মার্কিন-সংযুক্ত ফুলব্রাইট বিশ্ববিদ্যালয়কে "রঙিন বিপ্লব' উস্কে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করা হয়, যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষ নিয়েছিল।
ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক জাচারি আবুজার মতে, ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী ১৯৭৫ সালের যুদ্ধের স্মৃতি এখনো বহন করছে। তাদের কাছে চীনের আঞ্চলিক দাবি বা আগ্রাসনের চেয়েও বড় ভয় হলো "রঙিন বিপ্লব"। নথিতে চীনকে আমেরিকার মতো অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে নয়, বরং একজন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখানো হয়েছে। আবুজা আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় 'ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট' (USAID)-এর অর্থায়নে কাটছাট, বিশেষ করে এজেন্ট অরেঞ্জ এবং স্থলমাইন পরিষ্কারের প্রচেষ্টায় বিঘ্ন ঘটা দুই দেশের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে।
ভিয়েতনামের বর্তমান নেতা তো লাম ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। তার নেতৃত্বে ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসা ভিয়েতনামে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। তবে ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান এবং কিউবার প্রতি মার্কিন কঠোর নীতি ভিয়েতনামের রক্ষণশীলদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিয়েতনামের মিত্র কিউবার ওপর যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ ভিয়েতনামের কৌশলগত ভারসাম্যকে বিপর্যন্ত করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এই নথির বিষয়ে ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি "দ্বিতীয় মার্কিন আক্রমণ পরিকল্পনা" নিয়ে কথা না বললেও জানিয়েছে, তাদের নতুন অংশীদারিত্ব চুক্তি উভয় দেশের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য সহায়ক এবং এটি একটি স্বাধীন ও স্থিতিস্থাপক ভিয়েতনামের স্বার্থ রক্ষা করে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট, ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাহ্যিক বন্ধুত্ব বজায় রাখলেও, অভ্যন্তরে তারা আমেরিকাকে একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের সরকার ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রস্তুত রয়েছে।
তথ্যসূত্র: এপি
আইকে/টিএ