প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে শান-বাবুলের নতুন সুর
ছবি: সংগৃহীত
১২:০১ পিএম | ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দীর্ঘ দিনের পেশাদার পথচলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুঞ্জন ছিল, ছিল তুলনা আর অঘোষিত লড়াইয়ের গল্প। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দূরত্ব গলে গিয়ে বন্ধুত্বেই রূপ নিয়েছে। সমকালীন সঙ্গীত দুনিয়ার দুই জনপ্রিয় কণ্ঠ শান ও বাবুল সুপ্রিয় আবারও একসঙ্গে কাজ করলেন। শানের সুরে ‘আঁখিয়া’ গাইলেন বাবুল সুপ্রিয়, আর সেই সূত্রেই খোলামেলা আড্ডায় উঠে এল বন্ধুত্ব, বদলে যাওয়া সঙ্গীত শিল্প আর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অনুচ্চারিত গল্প।
দু’জনের সম্পর্কের শুরুটা নেহাতই পেশাদার ছিল না। পারিবারিক সূত্রেই আগে থেকে পরিচয়। বাবুল জানালেন, তাঁদের দুই মায়েরও ছিল গভীর বন্ধুত্ব। বাইরে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে গল্প শোনা যেত, তা নাকি আদৌ সত্য ছিল না। বরং কর্মজীবনের শুরু থেকেই তাঁরা একে অপরের ভরসার জায়গা। একসময় বাবুলের জনপ্রিয় ছবির গান মুক্তির পর শানের স্ত্রী মজা করে বলেছিলেন, পুরস্কার পেলে তাঁকে সোনার হার উপহার দিতে হবে। কিন্তু সেই সাফল্যের পরই নেমে আসে বাবুলের জীবনের কঠিন অধ্যায়।
শান মনে করিয়ে দেন, সেই সময় সঙ্গীত জগতে বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছিল। প্রেমের গান নিয়ে একঘেয়েমি তৈরি হয়েছিল, শ্রোতার রুচিও বদলাচ্ছিল দ্রুত। সেই পরিবর্তনের ধাক্কা সকলকেই সামলাতে হয়েছে। বাবুলের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে প্রায় আট বছর গান থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। তবে দূরে থাকলেও সুরচর্চা থামাননি তিনি। নতুন করে ফেরার পথে শানই তাঁকে উৎসাহ দেন, জানিয়ে দেন তাঁর কণ্ঠ আরও পরিণত হয়েছে, এখন একক গানে মন দেওয়ার সময়।
বর্তমান সঙ্গীত পরিস্থিতি নিয়ে দু’জনেরই আক্ষেপ স্পষ্ট। শানের মতে, এখন সবাই একক গানে মনোযোগী। গান শোনার অভ্যাসও বদলে গেছে। আগে একটি গান মুক্তি পেলেই সিডি বা ক্যাসেট কেনার হিড়িক পড়ত, পাড়ায় পাড়ায় বাজত একই সুর। এখন প্রত্যেকের হাতে মোবাইল, কানে হেডফোন। গান ব্যক্তিগত হয়ে গেছে, তাই তার বিস্তারও সীমিত। বাবুলও স্মৃতিচারণা করে বলেন, উৎসবের সময়ে কেনা দুটি সিডি গোটা পরিবারের সম্পদ হয়ে উঠত। সেই সম্মিলিত শোনার আনন্দ আজ আর নেই।
দীর্ঘ কেরিয়ারে শিল্পের ভেতরকার পরিবর্তনও তাঁরা দেখেছেন কাছ থেকে। শান জানান, আগে স্টুডিওতে দীর্ঘ সময় ধরে রেকর্ডিং চলত, অনেক সময় একঘেয়েও লাগত। তবু পেশাদারিত্বের খাতিরে নির্দেশ মেনেই গাইতে হতো। কখনও কখনও দ্রুত রেকর্ডিং শেষ করাই হয়ে উঠত শিল্পীর চাহিদার মাপকাঠি, গানের নিখুঁততা নয়। বাবুল স্বীকার করেন, এমনও সময় গেছে যখন মন না চাইলেও গান গাইতে হয়েছে। তবে এখন শিল্পীরা নিজেদের মতো কাজ করার স্বাধীনতা পাচ্ছেন, যদিও ভিড়ও বেড়েছে বহুগুণ।
ব্যক্তিগত জীবনের কথাতেও ছিল হাসি-ঠাট্টা। শান বলেন, তাঁর প্রিয় মানুষ যদি তাঁর গান না ভালোবাসেন, তবে তাঁকে ভালোবাসবেন কী করে। নতুন গান শোনালে স্ত্রী মজা করে বলেন, পারিশ্রমিকের চেক এলেই গানটি মন দিয়ে শুনবেন। বাবুলও বন্ধুর প্রসঙ্গে মজা করে জানান, স্ত্রীর হিসেবি স্বভাব না থাকলে শানের আর্থিক হাল নাকি বিপাকে পড়ত। নিজের রোমান্টিক সত্তার কথা বলতে গিয়ে বাবুল শোনালেন এক সরল ভালোবাসার গল্পনির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে পথের ধারে মোমবাতি আর বাদাম দিয়ে সেরে ফেলেছিলেন বিশেষ মুহূর্তের আয়োজন। তাঁর মতে, ভালোবাসা মানেই দামী আংটি নয়, আন্তরিকতাই আসল।

সমসাময়িক সঙ্গীত দুনিয়ায় আরেক আলোচিত প্রসঙ্গ অরিজিৎ সিং-এর প্লে-ব্যাক থেকে বিরতি। এ বিষয়ে শানের মত, এত বড় মাপের শিল্পীর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত। সময়ই অনেক কিছু নির্ধারণ করে দেয়। বাবুলের ধারণা, অরিজিতের হয়তো নতুন কোনো ভাবনা আছে, যা ধীরে ধীরে সামনে আসবে।
সব মিলিয়ে ‘আঁখিয়া’ শুধু একটি গান নয়, দুই বন্ধুর পুনর্মিলনের গল্পও বটে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়াল সরিয়ে যে বন্ধুত্ব বছরের পর বছর টিকে থাকে, সেই গল্পই যেন নতুন সুরে ফিরে এল শ্রোতার দরজায়।
পিআর/টিকে