© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা / কোনো গুলি না ছুড়েই আমেরিকার সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান আটকে দেবে চীন!

শেয়ার করুন:
কোনো গুলি না ছুড়েই আমেরিকার সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান আটকে দেবে চীন!

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:২৯ এএম | ১১ মার্চ, ২০২৬
এমন এক ‘যুদ্ধে’র জন্য পরিকল্পনাটা তৈরি করা হয়েছে, যে যুদ্ধে আমেরিকা এখনো নামতেই পারেনি। কারণ তারা ব্যস্ত অন্য একটি যুদ্ধে।

যুদ্ধের ধরনই এখানে আলাদা।

ওয়াশিংটন যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছে, বিশ্বজুড়ে শিরোনামে জায়গা করে নিচ্ছে তেলের দাম ও ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, তখন বেইজিং নীরবে একটি নথি প্রকাশ করেছে, যা আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

চীনের ১৪১ পৃষ্ঠার ১৫তম পঞ্চবার্ষিক এই পরিকল্পনা গত ৫ মার্চ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে প্রকাশ করা হয়। এতে এমন এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী কৌশল তুলে ধরা হয়েছে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি নির্ধারণ করার মতো প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও শিল্পে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

বিনিয়োগ বিশ্লেষক ও লেখক শানাকা আনসেলেম পেরেরা এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, ‘কেউ এদিকে নজর দিচ্ছে না। আসলে সেটাই মূল বিষয়।’

চীনের এই পরিকল্পনাটিকে সাধারণ অর্থনৈতিক নীতির নথির চেয়ে বরং একটি জাতীয় প্রযুক্তিগত মহাপরিকল্পনা বলেই বেশি মনে হবে।

পুরো নথিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে একেবারে পরিকল্পনার কেন্দ্রে জায়গা দেওয়া হয়েছে। আগামী দশকে চীন তাদের অর্থনীতির বড় অংশে এআই যুক্ত করতে চায় — এমন ইঙ্গিত দিয়েছে বেইজিং। মানবাকৃতির রোবট বা হিউম্যানয়েড রোবোটিক্সকে একটি প্রধান শিল্প হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে এর উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য চীনের।
পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, চীন মহাকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, পারমাণবিক ফিউশন গবেষণা দ্রুত এগিয়ে নেবে এবং ব্রেন–কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাবে।

অর্থনৈতিক লক্ষ্যও কম উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। এই পরিকল্পনার মেয়াদে শুধু এআই–সম্পর্কিত শিল্পই ১০ ট্রিলিয়ন (১০ লাখ কোটি) ইউয়ানের বেশি মূল্য অর্জন করতে পারে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এটি প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান।

এই পরিকল্পনার ব্যাপ্তি এমন যে দেখেই এটিকে একটি সমন্বিত জাতীয় শিল্প উদ্যোগ বলে মনে হবে, যেখানে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা নয়, বরং লক্ষ্যটা হলো - উৎপাদনশিল্প ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তিকে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা।

পেরেরার মতে, কৌশলটি এত ব্যাপক আকারের বলেই এটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘এটা কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়। এটা এমন এক যুদ্ধের পরিকল্পনা, যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র লড়ার অবস্থায়ই নেই।’

চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানের জবাবে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ভাবা হয় ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’কে। ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত আইনটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ঘরোয়াভাবে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শক্তিশালী করতে ৫২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে সরাসরি অনুদান হিসেবে ৩৯ বিলিয়ন ডলার এবং বিভিন্ন কর–প্রণোদনাও রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ১৪০টিরও বেশি ঘোষিত প্রকল্পে শত শত বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে এবং বিপুলসংখ্যক উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত — চিপস-কেন্দ্রিক।

কিন্তু এখানে বিষয়টি শুধু চিপস-এরই নয়। চীনের কৌশল এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে — সেটা ভারি শিল্প থেকে শুরু করে সেবা খাত পর্যন্ত সবজায়গাতেই। রোবোটিক্সকে শিল্প উৎপাদনের চালক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে।

পরিকল্পনায় এসবের সঙ্গে সমান তালে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ অবকাঠামো - এবং বিশেষ করে বলতে গেলে – আরও আধুনিক ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতায় বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ।

পেরেরা দুই কৌশলের পার্থক্য সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। লিখেছেন, ‘চিপস (যুক্তরাষ্ট্রের চিপস অ্যাক্ট) হলো একটা রাইফেল, আর (চীনের) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো পুরো একটা অস্ত্রাগার।’

এই অস্ত্রাগারের কেন্দ্রে রয়েছে বিরল খনিজ। বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ বিরল খনিজের উপাদান চীনই প্রক্রিয়াজাত করে। বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে মিসাইল গাইডেন্স (ক্ষেপণাস্ত্র নির্দেশনা) ব্যবস্থা কিংবা অত্যাধুনিক রাডার — সবকিছুর জন্যই দরকার বিরল খনিজ।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যে যুদ্ধবিমান – পঞ্চম প্রজন্মের, রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন সেই এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রতিটির ইঞ্জিন, সেন্সর ও অস্ত্র ব্যবস্থার পেছনে শত শত পাউন্ড বিরল খনিজ ধাতু লাগে। প্রতিপক্ষের মিসাইল রুখে দেওয়ার জন্য মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম কিংবা একেকটি আধুনিক যুদ্ধবিমানে ইলেকট্রনিক্স, জিপিএস জ্যামিং, রাডার, সেন্সর সমৃদ্ধ ‘ইলেকট্রনিক ওয়্যারফেয়ার’ বা নির্ভুল নির্দেশিত (প্রিসিশান গাইডেড) অস্ত্রও ঘুরেফিরে সেই বিরল খনিজের ওপরই নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং ধীরে ধীরে এই খাতের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। আরও বেশি বিরল খনিজ উপাদান তুলে আনা ও প্রক্রিয়াজাত করার প্রযুক্তিকে তারা নিয়ে গেছে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায়। লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা ও নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের ওপর চীন আরও সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কী করছে? তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের নীতিতে দেখা যাচ্ছে বিপরীত প্রবণতা। পেন্টাগন যে পরিকল্পনা করছে, তাতে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পেন্টাগনের চুক্তিগুলো থেকে চীনের কাছ থেকে বিরল খনিজ উপাদান কেনা ধীরে ধীরে বাদ দেওয়া হবে। তার ফল কী হবে? এতে মার্কিন সরবরাহকারীদের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে বা নতুন উৎস তৈরি করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই বিকল্প উৎস তৈরি বা খুঁজে নিতে যে কয়েক বছর বা দশক লেগে যাবে, ওই সময়ের পুরোটাই হয়ে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অরক্ষিত, দুর্বল’ সময়। কেন? এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বিভিন্ন যুদ্ধ বা সংঘাতে এমন সব অস্ত্র ও বিমান কাজে লাগাবে যেগুলোর পেছনে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ উপাদান প্রয়োজন হবে – যেমনটা ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। আবার অন্যদিকে নতুন খনি খোঁজা, প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কারখানা তৈরি করা ও ম্যাগনেট প্ল্যান্ট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে — যেগুলোর কিছুই এখনো বড় পরিসরে তৈরি হয়নি।

পেরেরা লিখেছেন, ‘ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিসাইল ইন্টারসেপটর (প্রতিপক্ষের মিসাইল বা ড্রোন আগেভাগেই ধ্বংস করার জন্য পাল্টা মিসাইল) শেষ হচ্ছে। আর চীন সেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সাপ্লাই চেইন আরও সরু করে ফেলছে।’ চীনের নতুন এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো সেই নথি, যা এই কৌশলকে জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় রূপ দিয়েছে।

শি চিন পিংয়ের ১৪১ পৃষ্ঠার এই রোডম্যাপের লক্ষ্য হলো – আধুনিক সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে যে সব উপাদান দরকার, তার সবগুলোর ওপর আগামী পনেরো বছর চীনের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে ফেলা। বিশ্লেষকদের মতে, যদি চীন সফলভাবে কাঁচামাল, রোবোটিক্স ও এআই প্রযুক্তিকে একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারে, তাহলে পরবর্তী বৈশ্বিক সুপারপাওয়ার কে হবে — সেই প্রতিযোগিতা হয়তো পারস্য উপসাগরের আকাশে এক যুদ্ধবিমানের সঙ্গে আরেক যুদ্ধবিমানের ‘ডগফাইটে’ নয়, বরং সাপ্লাই চেইন আর কারখানার মেশিনের গতিই ঠিক করে দেবে।

এবং সেটি নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান আকাশে ওঠার আগেই। এফ-৩৫-এর আকাশে ওড়াই আটকে দেওয়ার পথে এগিয়ে যাবে চীন, একটা বুলেটও খরচ না করে।

টিজে/এসএন 

মন্তব্য করুন