মনিরা শারমিন আপিলেও বাদ পড়লে শূন্য আসন পূরণ হবে কীভাবে?
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪৪ পিএম | ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াত জোটের একজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর শূন্য আসন পূরণ হবে কীভাবে, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ওই প্রার্থী আপিল করতে পারবেন, আদালতেও যেতে পারবেন। তাতেও প্রার্থিতা না ফিরলে উপ নির্বাচন দিতে হবে। আর তখন আসনটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। জোটের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা পড়ে মঙ্গলবার। এর মধ্যে বিএনপি জোটের মনোনয়নপত্র জমা দেন ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১৩ জন, আর স্বতন্ত্র জোটের একজন।
বাছাইয়ে জামায়াতের শরিক দল এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মঈন উদ্দীন খান।
ইসির এ যুগ্মসচিব বলেন, সরকারি চাকরি ছাড়ার তিন বছর পার না হওয়ায় মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হল।
ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াত ও স্বতন্ত্র জোটের ৫০ জনের মধ্যে কেবল মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়েছে। দল ও জোটের বাইরে দাখিল করা আরও তিনজনের মনোনয়নপত্র স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেনি ইসি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ (১) (চ) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরগ্রহণের পর তিন বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হবেন।
২০২৫ সালের মার্চে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান মনিরা শারমিন। তিনি ২০২৩ সালে নভেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে অফিসার (জেনারেল) পদে যোগ দেন, দুই বছর পর গেল ডিসেম্বর চাকরি ছাড়েন এনসিপি নেত্রী।
বুধবার (২২ এপ্রিল) আরপিওর বিধান তুলে ধরে রিটার্নিং অফিসার ইসির যুগ্ম সচিব মঈন উদ্দীন খান বলেছিলেন, আমরা জামায়াত জোটের ১৩টি মনোনয়নপত্র বাছাই করেছি, এর মধ্যে ১২টি বৈধ ঘোষণা করা হলো। একজনের মনোনয়নপত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত অপেক্ষমান (পেন্ডিং)। মনিরা শারমিন যে কাগজপত্র দিয়েছে, তাতে সরকারি পে স্কেলের কথা উল্লেখ রয়েছে। এজন্য তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণার পর মনিরা শারমিন বলেন, এদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করার পরও তিনি বাদ পড়েছেন। আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন।
তার আইনজীবী নাজমুস সাকিব বলেন, আগামী রোববার নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করব। প্রার্থিতা ফিরে পাব আশা করি। আমরা বুঝেশুনেই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি।
মনিরা শারমিনের এখন ইসিতে আপিল করার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই তাতে প্রার্থিতা ফিরে না পেলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার পথও খোলা আছে।
দেশে সংরক্ষিত নারী আসনে ভোটাভুটির নজির নেই। দল ও জোটের সমান সংখ্যক প্রার্থী থাকায় বরাবরই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা নির্বাচিত হন।
সংসদের সাধারণ নির্বাচনের পর দল/জোটের প্রাপ্ত আসন অনুযায়ী সংরক্ষিত আসন বণ্টন হয়। অতীতে সংরক্ষিত নারী আসনে ভোটের প্রয়োজন না হলেও এবার ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আগে কখনও সংরক্ষিত নারী আসনে ভোটাভুটির রেকর্ড নেই। এ নির্বাচনে দল ও জোট সমান সংখ্যক প্রার্থীই দিয়ে থাকে, আইন অনুযায়ী তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে ভোটার হচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। প্রয়োজন হলে তারা ভোট দিয়ে সংরক্ষিত আসনের সদস্য নির্বাচিত করবেন।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, কখনও ভোটাভুটির দরকার হলে রিটার্নিং অফিসার নির্ধারিত স্থানে পদ্ধতি মেনে ভোটের ব্যবস্থা করবেন। সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, বাছাইয়ের পর আপিলের সুযোগ রয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।
জোটের বরাদ্দ পাওয়া আসন শূন্য হলে কীভাবে ভোটের আয়োজন করা হবে, এ বিষয়ে আইনজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেন, সংশ্লিষ্ট শূন্য আসনে উপনির্বাচন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট আসন নির্দিষ্ট জোটের থাকবে না, সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
নির্বাচন কমিশন এরপর নতুন তফসিল ঘোষণা করবে। তফসিল অনুযায়ী উন্মুক্ত আসনটিতে সব রাজনৈতিক দল বা জোট নতুন করে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, এরপর সংসদ সদস্যদের ভোটে ওই সংরক্ষিত আসনটিতে সদস্য নির্বাচন করা হবে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, বাছাইয়ে মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় তার আপিলের সুযোগ রয়েছে। এরপরও প্রার্থিতা ফিরে না পেলে সরাসরি ভোটের প্রসঙ্গ আসবে। তাছাড়া উচ্চ আদালতে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে তার।
তবে রাজনৈতিক দল ও জোট সমঝোতায় পৌঁছলে শূন্য আসনটি যে জোট হারিয়েছে, সেটি তাদেরই হতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ৮ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল দেন এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২১ বুধবার ও বৃহস্পতিবার বাছাই করা হবে; ২৬ এপ্রিল আপিল করার সুযোগ রয়েছে নির্বাচন কমিশনে।
২৭ এপ্রিল ও ২৮ এপ্রিল আপিল নিষ্পত্তি হবে। ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ আর ভোট ১২ মে।
সরাসরি ভোটের জন্য ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৯৭৩ সালে ১৫ আসন ছিল সংরক্ষিত নারী আসন। পরে তা বাড়িয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদে ৩০টি আসন করা হয়।
আইনের মেয়াদ না থাকায় চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল না। মেয়াদ না থাকায় অষ্টম সংসদের শুরুতেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল না। তবে ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্থদশ সংশোধনী এনে আসন বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়।
নবম সংসদেও শুরুতে ৪৫টি আসন সংরক্ষিত ছিল। ওই সংসদেই ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীতে আরও ৫ আসন বাড়িয়ে সংরক্ষিত আসন করা হয় ৫০টি।
এসব আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বহাল রেখে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী আনা হয় ২০১৮ সালে। সে অনুযায়ী, ২০৪৩ সাল পর্যন্ত সংসদে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা।
এসকে/টিকে