© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

আলজাজিরার বিশ্লেষণইরানে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে মূল বাধা কোথায়?

শেয়ার করুন:
ইরানে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে মূল বাধা কোথায়?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৪:৫৮ এএম | ০৪ মে, ২০২৬
যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ইরানের দেয়া সবশেষ ১৪ দফার প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের চরম আস্থাহীনতাই এই চুক্তির পথে প্রধান বাধা।

বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়া এবং মার্কিন সামরিক আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া এই যুদ্ধের স্থায়ী অবসানে গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন প্রস্তাবটি দেয় তেহরান, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফা পরিকল্পনার জবাব।
 
গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি চললেও এখনও স্থায়ী শান্তি চুক্তি হয়নি। তেহরান চায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান, আর ট্রাম্পের দাবি, প্রথমে হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ তুলতে হবে (যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল-গ্যাস পরিবাহিত হয়) এবং পারমাণবিক সক্ষমতা বিসর্জন দিতে হবে, যা তার কাছে ‘রেড লাইন’। 
 
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরোধ করে ইরান। জবাবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বর্তমানে উভয় পক্ষই একে অপরের জাহাজে হামলা ও পথরোধ অব্যাহত রেখেছে।
 
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ১৪ দফার প্রস্তাব 
 
যুক্তরাষ্ট্রের দুই মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিপরীতে ইরান তাদের সবশেষ প্রস্তাবে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সব অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান করে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি চাইছে। এই প্রস্তাবের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা, ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি ‘নতুন কৌশল’ তৈরি করা।
 
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যার প্রেক্ষাপটে ইরান এই নিশ্চয়তাগুলো চাইছে। পাশাপাশি এনপিটি চুক্তির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারও চায় তারা। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাউদির মতে, কূটনীতি নাকি সংঘাত সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।
 
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মুসগ্রেভ জানান, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরান কিছুটা নমনীয় হয়ে সম্ভবত নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত থেকে সরে এসেছে, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে। তার মতে, পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশ এখনও ‘যোজন যোজন দূরে’। 
 
সুফান সেন্টারের কেনেথ কাটজম্যান মনে করেন, পারমাণবিক ইস্যুর চেয়ে বড় বাধা হলো ট্রাম্পের প্রতি ইরানের অবিশ্বাস। অবরোধ পুরোপুরি না তোলা পর্যন্ত তারা গভীরে যেতে নারাজ, যা সংঘাত আরও বাড়াতে পারে।
 
যুক্তরাষ্ট্রের জবাব
 
ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখা সম্পর্কে তাকে জানানো হয়েছে এবং তিনি তা পর্যালোচনা করছেন। তবে ইরান ‘খারাপ আচরণ’ করলে পুনরায় হামলা শুরুর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প দাবি করেন, কয়েক মাসের নৌ অবরোধে ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
 
যদিও শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, গত ৪৭ বছরে বিশ্বের যে ক্ষতি ইরান করেছে, তার পর্যাপ্ত মূল্য না চোকানোয় তাদের এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। 
 
পল মুসগ্রেভের ধারণা, ট্রাম্প হয়তো প্রস্তাবটি না পড়েই প্রত্যাখ্যান করেছেন। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি জানান, ৪৭ বছরের নিষেধাজ্ঞাও ইরানকে ভাঙতে পারেনি; বরং নৌ অবরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি হোয়াইট হাউসের ধারণার চেয়েও বেশি।
 
আগের প্রস্তাবগুলো কী ছিল? 
 
গত ৮ এপ্রিলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ঠিক এক দিন আগে ইরান ১০ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল (যাতে সংঘাত অবসান, হরমুজ প্রটোকল, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পুনর্গঠনের কথা ছিল)। ট্রাম্প এটিকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বললেও ‘যথেষ্ট ভালো নয়’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
 
মূলত ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৫ দফার একটি পরিকল্পনার জবাবে ইরান ওই প্রস্তাব দেয়। মার্কিন প্রস্তাবে এক মাসের যুদ্ধবিরতি, নাতাঞ্জ-ইসফাহান-ফোরদোর পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস, আইএইএ-র কাছে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, জাতিসংঘ নজরদারি, হরমুজ খুলে দেয়া ও সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না দিতেই সাময়িক যুদ্ধবিরতির ওই মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তেহরান।
 
মাঠপর্যায়ে বর্তমান পরিস্থিতি
 
যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির অভাবে তারা পুনরায় সংঘাত শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। রোববার এক্সে আইআরজিসির ইন্টেলিজেন্স ইউনিট জানায়, ট্রাম্পকে এখন অসম্ভব সামরিক অভিযান অথবা খারাপ চুক্তির যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে।
 
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এবং সামুদ্রিক মাইনের কারণে অচলাবস্থা তীব্র হয়েছে, হু হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম। প্রণালী খুলতে ১৩ এপ্রিল ইরানের সব বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধের পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১১১.২৯ ডলারে পৌঁছায়। 
 
ট্রাম্প এই অবরোধকে ‘অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা’ ও নিজেদের ‘জলদস্যু’র মতো উল্লেখ করায় তেহরান এটিকে ‘জলদস্যুতার নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছে।
 
ত্রিতা পার্সির মতে, এই অবরোধ ট্রাম্পের জন্যই বুমেরাং হয়েছে। কারণ, অবরোধ ছাড়াই কূটনীতি চলতে পারত এবং এতে তেলের দাম যুদ্ধের সময়ের চেয়েও বেড়ে গেছে। অবরোধ আরোপের আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেই ট্রাম্প সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন।
 
তিনি জানান, তেল সংকট সমাধানে ট্রাম্প এখন ‘মেরিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’ (এমএফসি) নামে একটি নৌ জোট গঠনের কথা ভাবছেন, যাদের মূল কাজ হবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের মাধ্যমে প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।

আরআই/টিএ

মন্তব্য করুন