নতুন অভিযোগে বলা হচ্ছে, ভারতের নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ করেছেন ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তারা জানান, দিল্লি থেকে আটক করে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজে তোলা হয় এবং পরে আন্দামান সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। যদিও জীবনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপ রোহিঙ্গাদের জীবনকে ‘চরম ঝুঁকির’ মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২৪ বছর বয়সী নুরুল আমিন জানান, তার ভাই খাইরুলসহ পরিবারের আরও চারজনকে ভারত মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, “আমার বাবা-মা ও স্বজনেরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছেন, সেটা কল্পনাও করতে পারিনি।”
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আটক রোহিঙ্গাদের প্রথমে দিল্লির বিভিন্ন থানায় ডাকা হয়। পরে তারা ইন্দরলোক আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর হিন্দন বিমানবন্দর থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। সেখানে পৌঁছে তারা নৌবাহিনীর একটি জাহাজে তোলা হয় এবং প্রায় ১৪ ঘণ্টা জাহাজে বন্দি থাকে। এই সময় অনেককে মারধর ও অপমান করা হয়।
৪০ জনের মধ্যে ১৫ জন খ্রিস্টান রোহিঙ্গা ছিলেন। তাদের জিজ্ঞেস করা হয় কেন ইসলাম ছেড়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন, কেন হিন্দু হননি। একজনকে কাশ্মিরের পেহেলগাম হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ করা হলেও প্রমাণ নেই।
রোহিঙ্গারা পরে স্থানীয় বাহটু আর্মির (BHA) আশ্রয়ে পৌঁছান। তবে তারা জানিয়েছেন, পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো, নিরাপত্তা নেই এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। সৈয়দ নূর বলেন, “আমরা এখানে নিরাপদ নই। পুরো এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্র।”
ভারতের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নুরুল আমিন বলেন, “আমার মনে শুধু ভয় কাজ করে, ভারত সরকার যে কোনো সময় আমাদেরও ধরে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে। এখন আমরা ঘর থেকে বের হতে পারছি না।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদক টমাস অ্যান্ড্রুজ বলেন, “রোহিঙ্গারা ভারতে থাকতে চায়নি, তারা মিয়ানমারের ভয়াবহ সহিংসতা থেকে পালিয়ে এসেছে। তাদের জীবন বাঁচানোই প্রধান উদ্দেশ্য।”
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ১৭ মে নুরুল আমিনসহ আত্মীয়রা আবেদন করেন, যাতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো বন্ধ করা হয় এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তবে বিচারপতি অভিযোগকে “অবাস্তব কল্পনা” বলে মন্তব্য করেছেন। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত হয়েছে, তখন সিদ্ধান্ত হবে তারা রোহিঙ্গা হিসেবে থাকবেন নাকি ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে ফেরত পাঠানো হবে।
বর্তমানে ভারতে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ রোহিঙ্গা জাতিসংঘের শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত, তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। ২০১৭ সালের সেনা অভিযানের পর লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।
এমকে/এসএন