ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে একের পর এক আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনও আক্রমণাত্মক, কখনও বা বিদ্রুপাত্মক এসব মন্তব্যকে ঘিরে দিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি হলেও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত রয়েছে ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এসব বক্তব্যকে ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’ হিসেবে দেখলেও, চলমান ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনার কথা বিবেচনায় রেখে সংযত অবস্থান নেয়ার পক্ষে মত দিচ্ছে দেশটির কূটনৈতিক মহল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ এক মন্তব্য দিল্লিতে ব্যাপক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প সবার সামনে প্রকাশ্যে দাবি করেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন— ‘স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি, প্লিজ?’ জবাবে আমি বলেছিলাম ‘হ্যাঁ’।” তবে এ মন্তব্যের পরও ভারত সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এর আগেও ট্রাম্প একাধিকবার ভারতকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন মন্তব্য করলেও দিল্লি সাধারণত চুপই থেকেই। এছাড়া গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর ওয়াশিংটন যে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী মোদি তার ওপর ‘খুব একটা খুশি নন’। যুক্তরাষ্ট্রের ওই সিদ্ধান্তে ভারতের ওপর শুল্কের হার ২৫ শতাংশ বেড়ে মোট ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ভারত তাকে জানিয়েছে— তারা (ভারত) নাকি পাঁচ বছর ধরে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এটা বদলাচ্ছি... ভারত ৬৮টি অ্যাপাচি অর্ডার দিয়েছে’। তবে দিল্লিতে সরকারি সূত্র এই দাবি নাকচ করে জানায়, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ২৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কিনেছে, এর মধ্যে ২২টি ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য এবং ৬টি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য। সবগুলো হেলিকপ্টারই ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে।
২২টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের প্রথম চুক্তিটি হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। অবশ্য ওবামা প্রশাসনের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও সেগুলোর সরবরাহ সম্পন্ন হয় ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে।
আর ৬টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের দ্বিতীয় চুক্তিটি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় স্বাক্ষরিত হয়। তবে এই চুক্তি অধীনে ধাকা হেলিকপ্টারগুলো সরবরাহে বিলম্ব হয় এবং হেলিকপ্টারগুলো ২০২৪ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারির বদলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির হোয়াইট হাউস সফরের সময়ও এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল।
এদিকে ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য ভারতে রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও ভারতীয় কূটনৈতিক মহল সংযম বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় উল্টো ফল দেয় এবং যখন ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন প্রকাশ্যে ‘পয়েন্ট স্কোরিং’-এর কোনও অর্থ নেই।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এক সূত্র বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী বলছেন, তার প্রতিটি কথার আলাদা করে ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের মূল মনোযোগ থাকা উচিত বাণিজ্য আলোচনায়, কারণ সেটাই অগ্রাধিকার’।
অবশ্য গত বছরের আগস্টেও ট্রাম্প একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। সে সময় মার্কিন রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি মোদিকে বলেছিলেন— যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কোনও বাণিজ্য চুক্তি করবে না, বরং এতো বেশি শুল্ক আরোপ করবে যে (ভারতের) ‘মাথা ঘুরে যাবে’।
ওই সময় ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর ট্রাম্প বলেন, আমি চমৎকার একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছি, নরেন্দ্র মোদি। আমি বললাম— আপনার আর পাকিস্তানের মধ্যে কী হচ্ছে? ট্রাম্প বলেন, ‘ঘৃণাটা ছিল প্রচণ্ড। এটা অনেক দিন ধরে চলছে, শত বছর ধরে আলাদা আলাদা নামে... আমি বললাম, আমি আপনাদের সঙ্গে কোনও বাণিজ্যচুক্তি করতে চাই না... আপনারা তো পারমাণবিক যুদ্ধে জড়াবেন... আমি বললাম, কাল আমাকে ফোন দিয়েন। কিন্তু আমরা কোনও চুক্তি করব না, না হলে এত শুল্ক বসাব যে আপনাদের মাথা ঘুরে যাবে... পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেল। হয়তো আবার শুরু হবে, কিন্তু তেমনটা হলে আমি তা থামিয়ে দেব।
ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যমের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দিল্লি ট্রাম্পের কিছু বক্তব্য ‘যাচাই করে ভুল প্রমাণ’ করলেও, এতে তিনি ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত–পাকিস্তান সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব নেয়া থেকে বিরত হননি।
এমন অবস্থায় বুধবার লুক্সেমবার্গে প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, অনেক সময় দূরের দেশগুলো উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, কিন্তু নিজের অঞ্চলের ঝুঁকির দিকে তাকাতে চায় না। তিনি বলেন, যারা সহযোগিতা করতে চায় এবং ইতিবাচক ভূমিকা নেয়, ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও সে অনুযায়ী হবে। আর যারা পাকিস্তানের মতো আচরণ করে, তাদের সঙ্গে ভিন্নভাবে মোকাবিলা করা হবে।
বিশ্ব পরিস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলে—এমন প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, দূরে বসে থাকা মানুষজন ‘নানা কারণে মন্তব্য করে’— কখনও ভেবে, কখনও না ভেবে, কখনও স্বার্থে, কখনও অসতর্কভাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের সরাসরি স্বার্থ দেখেই সিদ্ধান্ত নেয়।
ভারতের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময়ও অনেক দেশ ভারতকে পরামর্শ দিয়েছিল। ভারত সেটাকে বৈশ্বিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়েছে। তার ভাষায়, বিশ্বের চরিত্রটাই এমন— মানুষ যা বলে, তা সবসময় তারা নিজেরা করে না। আর সেটি সেইভাবেই গ্রহণ করতে হয়।
এবি/টিকে