জনপ্রতিনিধি সঠিক কাজ না করলে ‘ম্যান্ডেট রিভিউ’ সিস্টেম থাকা উচিত

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যদি তার কাজ যথাযথভাবে না করেন তাহলে রিকল সিস্টেম থাকা উচিত। অর্থ্যাৎ এলাকার জনগণ লিখিত দাবি দিয়ে যদি বলে তাদের জনপ্রতিনিধির ম্যান্ডেট পুনরায় বিবেচনা করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও রাখার দাবি জানিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) গুলশানের একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত “জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: আগামী সরকারের জন্য নাগরিক সুপারিশ” শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এমন বিষয় উপস্থাপন করেন সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে সক্রিয় নাগরিকত্ব ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। অন্যান্য সংস্কারগুলো টেকসই করতে হলে এটি সবার আগে বাস্তবায়ন করা জরুরি। আরেকটি অন্যতম বিষয় হলো সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কোনো জনপ্রতিনিধি যদি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করেন, তবে তাকে অপসারণের জন্য রিকল সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, কোনো এলাকার জনগণ যদি লিখিত দাবির মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধির ম্যান্ডেট পুনরায় বিবেচনা করতে চান, তবে সেই আইনি ব্যবস্থা সংবিধানে থাকতে হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, আমরা ১২টি সুনির্দিষ্ট নীতি ও বিবৃতি তৈরি করেছি। এর মধ্যে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করা অপরিহার্য। এটি সম্ভব হলে দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তবে, এর জন্য একটি জবাবদিহিতামূলক সংসদ প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। দেশে বর্তমানে এক ধরনের প্ল্যান হলিডে বা পরিকল্পনা স্থবিরতা চলছে।

আমাদের দক্ষতা ও সুশাসনকেন্দ্রিক স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই পরিকল্পনায় দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সুযোগ তৈরি এবং বৈদেশিক ঋণের সুব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। আমরা মূলত আর্থিক খাতে টেকসই সুশাসন ফিরিয়ে আনতে চাই।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম কারিগর যুব সমাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণদের কীভাবে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা যায়, সেজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, যা বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী। তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমবাজারে সক্রিয় করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। এ ছাড়া, পিছিয়ে পড়া নারী ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশের উন্নতিতে কৃষির বড় ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের সার্বিক উন্নতি করতে হলে কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের শ্রমশক্তির ৪১ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত থাকলেও জিডিপিতে এর অবদান মাত্র ১২ শতাংশ। শ্রম ও পুঁজির উৎপাদনশীলতা এখানে অনেক কম। এই সীমাবদ্ধতা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, সেই পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর সঙ্গে কৃষি ও শিল্পের সংযোগ ঘটাতে হবে। পাশাপাশি ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা ও ভূমি প্রদানের বিষয়টিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, গুণমানসম্পন্ন আধুনিক শিক্ষা, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে হাওর ও চর অঞ্চলে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গুণগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও আমাদের বেশ কিছু পরামর্শ রয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্বালানি নিশ্চয়তার সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা জড়িত। আমরা দেখেছি, বাপেক্সকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করা হয়েছে এবং পরনির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে; এ বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাস আহরণ বৃদ্ধি করা, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি বাড়ানোর সুপারিশ করেছি। এ ছাড়া, সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দরকার। আমাদের পরিকল্পিত নগরায়ণ প্রয়োজন। শহরগুলোকে বাসযোগ্য করতে নগর পরিষেবার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সব ধরনের দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়েও সুপারিশ রয়েছে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, আমরা জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলছি। বিষয়টি অনেক জায়গায় বারবার উঠে এসেছে-যেমন দলিত ও আদিবাসীরা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হন। আমরা সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের জন্য পৃথক কমিশন গঠনের সুপারিশ করছি। বর্তমানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

এ ছাড়া পাহাড়ি, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ভূমি কমিশনের কথা বলেছি। আমরা আশা করছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন একটি সরকার নির্বাচিত হবে। সেই সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ করতে হবে এবং চলমান বাস্তবতায় কিছু কাজের প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা বা রিভিউ করতে হবে।

আরআই/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলা, কার হাতে ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি? Jan 15, 2026
সিইসির সাথে বৈঠক শেষে যা বললেন সালাউদ্দিন আহমেদ Jan 15, 2026
img
কবে শুরু হচ্ছে আমিরের বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘দাদাসাহেব ফালকে’র শুটিং? Jan 15, 2026
মোস্তাফিজের বিষয়ে প্রতিবাদ না করা নিয়ে যা বললেন ক্রিকেটাররা Jan 15, 2026
মিমি চক্রবর্তীর ক্যারিয়ার এবং পেশাদারিত্বের গল্প Jan 15, 2026
img
যমুনার উদ্দেশে রওনা হলেন তারেক রহমান Jan 15, 2026
img
ভিডিও ফাঁস, পূজা চেরীকে দেখে চমকে গেল নেটদুনিয়া Jan 15, 2026
img
শাকিবের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে প্রযোজকের মন্তব্য Jan 15, 2026
img
‘ব্লাফ’ ট্রেলারেই ‘আলট্রা ওম্যান’ হয়ে চমক দেখালেন প্রিয়াঙ্কা! Jan 15, 2026
img
আচরণবিধি লঙ্ঘনে চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি প্রার্থীকে শোকজ Jan 15, 2026
img
‘আমাদের আয়ের বেশিরভাগ আসে আইসিসি ও স্পন্সর থেকেই’ Jan 15, 2026
img
পা ধরে সালাম করে হওয়া রাষ্ট্রপতি পেতে না চাইলে গণভোটে হ্যাঁ দিন: আলী রীয়াজ Jan 15, 2026
img
প্রতারণার ফাঁদে দীপক তিজোরী, পুলিশের দ্বারস্থ অভিনেতা! Jan 15, 2026
img
ঢাবির বাসে সাত কলেজের হামলায় সাংবাদিকসহ আহত ৭ Jan 15, 2026
img
অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত এবারের বিপিএল Jan 15, 2026
img
ইরানকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প Jan 15, 2026
img
ভাগ্য নয়, পরিশ্রমই জীবনের আসল শক্তি: মিঠুন চক্রবর্তী Jan 15, 2026
img

বরিশাল-৩ আসন

তারেক রহমানের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন স্বতন্ত্র প্রার্থী Jan 15, 2026
img
মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মেডিকেল কলেজ বন্ধ করল ভারত Jan 15, 2026
img
সরকারি প্রকল্পের গাছ কাটতেও নিতে হবে অনুমতি: হাইকোর্ট Jan 15, 2026