ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৮ অজ্ঞাতনামা শহীদের পরিচয় শনাক্ত

ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পর জুলাই অভ্যুত্থানের অজ্ঞাতনামা ৮ শহীদের নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আয়োজিত ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অজ্ঞাতনামা শহীদদের মরদেহ পরিচয় শনাক্তকরণ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীর প্রতীক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বক্তব্য রাখেন।

ময়মনসিংহের ফুলপুর থানার ফুলপুর গ্রামের গাজী মামুদ এবং জোসনা বেগমের ছেলে মো. মাহিন মিয়া (২৫)। তিনি ১৮ জুলাই, ২০২৪ সালে মারা যান।
শেরপুরের শ্রীবরদীর আব্দুল মালেক এবং আয়েশা বেগমের ছেলে আসাদুল্লাহ। তিনি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মারা যান।

চাঁদপুরের মতলব থানার বারোহাতিয়া গ্রামের সবুজ বেপারী ও শামসুন্নাহারের ছেলে পারভেজ বেপারী। তিনি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মারা যান।
রফিকুল ইসলাম, সাতকাছিমা গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বার সিকদারের ছেলে, নাজিরপুর থানা, পিরোজপুর। তিনি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মারা যান। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং-এর মো. লাল মিয়া ও রাশেদা বেগমের ছেলে সোহেল রানা। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মারা যান।

রফিকুল ইসলাম, ফেনী সদর, ফেনীর মৃত খোরশেদ আলমের ছেলে। তিনি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মারা যান। ফয়সাল সরকার, কাচিমারা গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে, দেবিদ্বার থানা, কুমিল্লা। তিনি ২২ জুলাই, ২০২৪ সালে মারা যান।

কাবিল হোসেন (৫৮), ঢাকার মুগদা থানা লেনের বাসিন্দা মৃত বুলু মিয়া এবং শামেনা বেগমের ছেলে। তিনি ২ আগস্ট, ২০২৪ সালে মারা যান। রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে এ পর্যন্ত ১১৪ জনের অজ্ঞাত মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন করা হয়।

কবর শনাক্তের পর আটটি পরিবারের কাছে তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অনেক অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা এতোদিন জানতেন না নিহতদের কবর কোথায়।

১৮ মাস পর নিহতের কবর দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই কার্যক্রমের আওতায় ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে এরইমধ্যে ৯টি ভুক্তভোগী পরিবারের দেয়া নমুনার ভিত্তিতে ৮ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

এর আগে, অজ্ঞাত নিহতদের শনাক্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। সিআইডির তথ্যমতে, নয়টি পরিবারের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, যার ফলে আটজন শহীদের শনাক্তকরণ সফলভাবে করা সম্ভব হয়েছে।

বাকি মৃতদেহের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলছে। সিআইডি জানিয়েছে যে, পুরো অভিযানটি আইন, মানবাধিকার নীতি এবং আন্তর্জাতিক মান মেনে পরিচালিত হয়েছে, যা মর্যাদা, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে।

এ উদ্যোগ নিখোঁজ শহীদদের পরিবারের অনিশ্চয়তা দূর করতে সাহায্য এবং ভবিষ্যতের বিচারিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নিহত বেশ কয়েকজন পুরুষ ও নারী শহীদের মরদেহ প্রাথমিকভাবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। সরকারের সিদ্ধান্তের পর, তাদের পরিচয় নির্ধারণে পদক্ষেপ নেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডিকে এই কর্মসূচির সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. মরিস টিডবল-বিঞ্জ দুই দিনের কর্মশালার মাধ্যমে সিআইডি ফরেনসিক, ডিএনএ এবং মেডিকেল টিমকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় এবং মিনেসোটা প্রোটোকল অনুসারে আরেক আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. লুইস ফন্ডেব্রিডারের নেতৃত্বে মৃতদেহ উত্তোলন এবং শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়।

মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা একটি সাধারণ ডায়েরি শেষে আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর, মোট ১১৪টি মৃতদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ বিশ্লেষণের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

রায়েরবাজার কবরস্থানে একটি অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করা হয়। যেখানে ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত ফরেনসিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সকল নিহতের হিসাব না পাওয়া এবং মর্যাদার সাথে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত বাকি শহীদদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শহীদ বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে শহীদ পরিবারের দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিহতের পরিচয় শনাক্তে আন্তর্জাতিক মান ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা এবং এই সংবেদনশীল কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

কার্যক্রমটির নেতৃত্বে ছিলেন সিআইডি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়।

এর আগে, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি মি. মরিস টিডবাল বিঞ্জ যিনি বিচারবহির্ভূত ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার, তিনি বাংলাদেশে এসে সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএ ও মেডিকেল ফরেনসিক টিমকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ মরদেহ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, প্রোফাইলিং এবং পুনঃসমাধিস্থকরণ—সমগ্র প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পন্থা অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে। এই প্রটোকল সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর তদন্তে মানবাধিকার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা হিসেবে স্বীকৃত।

এই কার্যক্রমে সিআইডির পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।

রায়েরবাজারে পরিচালিত বৃহৎ পরিসরের এই ফরেনসিক কার্যক্রম বাংলাদেশে মানবাধিকারভিত্তিক তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে শহীদ পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষিত হয়েছে।

এবি/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
নেত্রকোনায় বিএনপিতে যোগ দিলেন জাতীয় পার্টির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী Jan 17, 2026
img
বিহারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো কিশোরের, মরদেহ ফেলে মাছ লুটে ব্যস্ত জনতা Jan 17, 2026
img
ইসলামী আন্দোলনের একক নির্বাচনের সিদ্ধান্তে জামায়াতের প্রতিক্রিয়া Jan 17, 2026
img
ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ভেনেজুয়েলার দুই নেত্রী Jan 17, 2026
img
বিক্ষোভ দমনে মিনেসোটায় সেনা মোতায়েনের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের Jan 16, 2026
img
হার্ট অ্যাটাক করেছেন মাহমুদুর রহমান মান্না Jan 16, 2026
img
ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর চুয়েট Jan 16, 2026
img
নবম পে-স্কেল: কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিলো ঐক্য পরিষদ Jan 16, 2026
img
সিঙ্গেল না নেওয়ায় স্মিথের ওপর বাবরের ‘অসন্তুষ্টি’ Jan 16, 2026
img
এবার হেড কোচের ভূমিকায় কাইরন পোলার্ড Jan 16, 2026
img
নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই, নির্বাচন খুব ভালোভাবে হবে: প্রেস সচিব Jan 16, 2026
img
ইসলামী আন্দোলনের জন্য জোটের দরজা খোলা রয়েছে : আসিফ মাহমুদ Jan 16, 2026
img
কিশোর-কিশোরীদের আসক্তি কমাতে অভিভাবকদের হাতে নিয়ন্ত্রণ দেবে ইউটিউব Jan 16, 2026
img
অনির্বাণের হয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন দেব Jan 16, 2026
img
গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে : আদিলুর রহমান Jan 16, 2026
img
মাস্কের এক্সএআই-র বিরুদ্ধে অশ্লীল ছবি তৈরির অভিযোগে তার সন্তানের মায়ের মামলা Jan 16, 2026
img
অবশেষে দুবাই থেকে আসছে বিপিএলের ‘হীরাখচিত’ ট্রফি Jan 16, 2026
img
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার নথি জব্দ ও সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার দাবি ডা. এফ এম সিদ্দিকের Jan 16, 2026
img
আগামীকাল বাংলাদেশে আসছে আইসিসির প্রতিনিধি দল Jan 16, 2026
img
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা অস্ট্রেলিয়ার, প্রথম মাসেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ ৪৭ লাখ কিশোর-কিশোরীর Jan 16, 2026